লন্ডনে কমছে অপরাধের হার, নেতিবাচক অপপ্রচারের জবাব দিলেন মেয়র সাদিক খান

লন্ডনে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে দাবি করেছেন শহরের মেয়র সাদিক খান এবং পুলিশ প্রধান মার্ক রাউলি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রিটিশ রাজধানীকে একটি আইনহীন ও বিপজ্জনক শহর হিসেবে চিত্রিত করার যে নেতিবাচক প্রচারণা চলছে, তা মোকাবিলা করে পর্যটকদের আশ্বস্ত করতে তারা এই নতুন পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছেন।

মেট্রোপলিটন পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পূর্ববর্তী এক বছরে ফোন চুরি, পকেটমারি, গৃহস্থালি চুরি এবং গাড়ি সংক্রান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন 'পাড়া-মহল্লার অপরাধ' ১৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণীয় এলাকা যেমন পার্লামেন্ট, সোহো এবং লেস্টার স্কয়ার সমৃদ্ধ ওয়েস্টমিনস্টার বরোতে এই ধরনের অপরাধ কমেছে এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এছাড়া পার্শ্ববর্তী পর্যটন এলাকা ক্যামডেনে অপরাধ কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ বা এক-চতুর্থাংশ।

তা সত্ত্বেও, মেয়র সাদিক খান জানান যে গত দুই বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লন্ডনকে 'বিপজ্জনক' বা অবক্ষয়ের শিকার হিসেবে দাবি করা পোস্ট বা সংবাদের সংখ্যা ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের একাংশ প্রায়শই অভিবাসী ও মুসলিমবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিলিয়ে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে। মেয়র এর জন্য সামাজিক মাধ্যমের 'আউটরেজ ইকোনমি' বা ক্ষোভ ছড়ানোর ব্যবসাকে দায়ী করেছেন, যা নেতিবাচকতাকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জন করে। ২০১৬ সাল থেকে লন্ডনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাদিক খান নিজেই এই অপপ্রচারের বড় লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মের মালিক ইলন মাস্ক এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে বিভিন্ন সময় আক্রমণ করেছেন। ট্রাম্প তাকে 'পাথর-কঠিন ব্যর্থ মানুষ' (stone-cold loser) এবং 'ভীষণ খারাপ মেয়র' বলে অভিহিত করেছিলেন।

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) সাদিক খান বলেন, "আমরা জানি যে লন্ডন নিয়ে নেতিবাচক খবর ছড়িয়ে অর্থ উপার্জনকারী বট ফার্ম রয়েছে। রাশিয়া ও চীনের মতো রাষ্ট্রীয় পক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মেগা (MAGA) সমর্থিত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা লন্ডনকে ছোট করতে চায়। কারণ আমরা উদারপন্থী, প্রগতিশীল, বহুসাংস্কৃতিক এবং অত্যন্ত সফল একটি শহর।" তিনি আরও যোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো যদি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ না নেয়, তবে কঠোর সরকারি নিয়মকানুন বা রেগুলেশন আনা প্রয়োজন।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অন্যান্য বড় শহরের মতো লন্ডনেও সহিংস অপরাধের সংখ্যা কমছে। ২০২৫ সালে শহরে ৯৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন এবং জনসংখ্যা অনুপাতে প্যারিস, বার্লিন বা নিউইয়র্কের চেয়েও কম। তবে এটি লন্ডনের অপরাধ চিত্রের একটি অংশ মাত্র। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের জেরে লন্ডনে মুসলিম ও ইহুদিদের লক্ষ্য করে ঘৃণামূলক অপরাধ (হেট ক্রাইম) বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মেয়র। তিনি বলেন, "আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন এই সম্প্রদায়ের মানুষ অপরাধের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার সাহস পায়। তাদের উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে আমাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, যাতে কেউ নিজের ধর্ম পালনে ভয় না পায়।"

অন্যদিকে, ফোন ছিনতাই, দোকানে চুরি এবং সাবওয়েতে ভাড়া ফাঁকি দেওয়ার মতো দৈনন্দিন অপরাধগুলো নগরবাসীর জীবনযাত্রার মানকে ব্যাহত করছে। পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে টহল বৃদ্ধি, অপরাধীদের লক্ষ্য করে গোয়েন্দা অভিযান এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তারা এই অপরাধগুলো নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মার্ক রাউলি বাহিনীর 'উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল' কিন্তু বিতর্কিত ফেসিয়াল রিকগনিশন (মুখাবয়ব শনাক্তকরণ) প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "রাস্তায় কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এবং একবিংশ শতাব্দীর সেরা প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি এই সনাতন পুলিশিং পদ্ধতি ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।"

২০২২ সালে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া রাউলি এমন এক সময়ে এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যখন পূর্ববর্তী বেশ কিছু কেলেঙ্কারি এবং একটি স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশের ভেতর যৌন হয়রানি, সমকামী বিদ্বেষ ও প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদের প্রমাণ মেলার পর তারা জনআস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। এছাড়া পুলিশের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গদের প্রতি পক্ষপাতমূলক বা 'দ্বি-স্তরীয়' পুলিশিংয়ের অভিযোগও তুলছে কট্টর ডানপন্থীরা। এই প্রসঙ্গে রাউলি বলেন, "পুরো সমাজই পুলিশের ওপর আস্থা রাখতে পারে। আমাদের প্রতিনিয়ত সংস্কৃতি যুদ্ধের (কালচার ওয়ার) যেকোনো এক পক্ষে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়, কিন্তু আমরা তা বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করি। আমরা কোনো ভয় বা পক্ষপাতিত্ব ছাড়া আইনের অধীনে কাজ করি। প্রতিটি নাগরিককে রক্ষা করাই আমাদের দায়িত্ব।"

লন্ডনে পড়তে আসা যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী জুলিয়ান সুইটেন বলেন, "লন্ডন আমেরিকার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ মনে হয়। এখানে বন্দুক সহিংসতার ভয় নেই বললেই চলে।" তবে লন্ডনের স্থানীয় ৭৮ বছর বয়সী শিল্পী ভিকি হকিন্স মনে করেন, অপরাধের পরিস্থিতি আগের মতোই আছে। তিনি বলেন, "আমি জানি মানুষ আজকাল বেশি অনিরাপদ বোধ করে, কিন্তু আমি করি না। তবে নিজের ভাগ্যকে অতিরিক্ত পরীক্ষা করতেও আমি রাজি নই।"