যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত জুন মাসে রেকর্ড সংখ্যক অভিবাসীকে আটক করেছে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)। নতুন প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ৪৩,০০০-এরও বেশি মানুষকে অভিবাসী আটককেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে, যা ট্রাম্পের এই মেয়াদে যেকোনো একক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আইসিই-র অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস থেকে আইসিই-র ওপর গ্রেফতার বাড়ানোর জন্য ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের প্রতিদিন ২,০০০ অভিবাসীকে গ্রেফতারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন মাসে প্রতিদিন গড়ে ১,৪৩৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং জুলাইয়ের প্রথম ১১ দিনে এই গড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিন ১,৫৯৩ জনে। অবশ্য হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন যে, আইসিই-র জন্য গ্রেফতারের কোনো নির্দিষ্ট কোটা বা লক্ষ্যমাত্রা নেই।
মিনিয়াপলিস, শিকাগো বা লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো বড় শহরগুলোতে অতীতে যেভাবে বড় আকারের ও ব্যাপক প্রচারিত অভিযান চালানো হতো, বর্তমানে তেমন কোনো প্রচার ছাড়াই আইসিই তাদের এই গ্রেফতার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে মিনেসোটায় পরিচালিত 'অপারেশন মেট্রো সার্জ' শেষ হওয়ার পর মাসিক গ্রেফতারের সংখ্যা কিছুটা কমেছিল, তবে সম্প্রতি তা আবার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
টেক্সাস এবং মেইনে চলতি মাসে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির সময় আইসিই কর্মকর্তাদের গুলিতে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিবাসন নীতি ও তাদের কার্যপদ্ধতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে তীব্র সমালোচনার মুখেও প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই বহিষ্কার অভিযান বন্ধ হবে না। সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে 'বর্ডার জার' (সীমান্ত বিষয়ক প্রধান) টম হোমান বলেন, "আইসিই কোনোভাবেই রাস্তা থেকে সরে যাচ্ছে না।" পরবর্তীতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটির তহবিল নিয়ে কংগ্রেসে অচলাবস্থার কারণে বিভাগটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় কয়েক মাস গ্রেফতারের সংখ্যা কম ছিল।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিন তার নিয়োগ সংক্রান্ত শুনানিতে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তিনি এমন একটি কৌশল অবলম্বন করতে চান যাতে এই সংস্থাটি প্রতিদিন সংবাদপত্রের শিরোনামে না আসে। গত শুক্রবার সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি সেই লক্ষ্যের পুনরাবৃত্তি করেন এবং সংস্থার অভিযানের পক্ষে সাফাই গেয়ে দাবি করেন যে, গ্রেফতারের সংখ্যা "প্রতিদিনই নতুন নতুন রেকর্ড স্পর্শ করছে।" তিনি বলেন, "আমি চুলার তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়েছি যাতে পানি উপচে না পড়ে। আপনাদের (গণমাধ্যমের) ক্ষেত্রে তাপমাত্রা কমালেও, রাস্তায় আমরা কাজের গতি বাড়িয়ে দিয়েছি। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর পরিশ্রম করছি কারণ আমরা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের কাজ করার পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছি।"
সম্প্রতি গুলিবর্ষণের ঘটনার পর আইসিই এজেন্টদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুত তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট দিয়ে সেই নির্দেশ বাতিল করেন। গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করাকে তিনি অপরাধ দমনের অন্যতম "সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকর হাতিয়ার" হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রাম্পের এই পোস্টের দিন অর্থাৎ ১৫ জুলাই সেন্টার ফর ইমিগ্রেশন স্টাডিজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোমান বলেন, "প্রেসিডেন্ট আজ সকালে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, তিনি চান আইসিই মাঠে নেমে তাদের কাজ করুক এবং সেটাই হতে যাচ্ছে।"
গ্রেফতারের এই আকস্মিক বৃদ্ধির কারণে চলতি বছরে প্রথমবারের মতো জুন মাসে আইসিই আটককেন্দ্রগুলোতে বন্দির গড় সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে গড়ে প্রায় ৫৯,৪০০ জন অভিবাসী আটককেন্দ্রে বন্দি ছিলেন, যা মে মাসে ছিল ৫৮,২০০ জন। আর জুলাইয়ের প্রথম ১১ দিনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আটককেন্দ্রে বন্দির গড় সংখ্যা ৬৫,৬০০ ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে জানুয়ারিতে বন্দির সংখ্যা সর্বোচ্চ ৭২,০০০-এ পৌঁছানোর পর ফেব্রুয়ারিতে মিনেসোটার অপারেশন মেট্রো সার্জ শেষ হলে বন্দির সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল।
টেক্সাস এবং মেইনে গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিহত দুই ব্যক্তি আইসিই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিলেন না। ডিএইচএস এই ধরনের গ্রেফতারকে "কোল্যাটারাল" বা আনুষঙ্গিক গ্রেফতার হিসেবে অভিহিত করে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় আটক হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রায়শই কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ বা সাজা থাকে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই বহিষ্কার অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে আটককেন্দ্রে বন্দি সংখ্যার ওঠানামা মূলত অপরাধের রেকর্ড নেই এমন ব্যক্তিদের আটক করার হারের ওপর নির্ভর করছে। গত বছর যখন বন্দির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল, তখন অপরাধের রেকর্ডহীন অভিবাসীরাই ছিলেন আটককেন্দ্রগুলোর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল গ্রুপ। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে আটক বন্দির সংখ্যা যখন কমছিল, তখন অপরাধের রেকর্ডহীন বন্দির সংখ্যা কমেছিল ৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিতদের সংখ্যা কমেছিল মাত্র ৩ শতাংশ এবং বিচারাধীন মামলা থাকা বন্দিদের সংখ্যা কমেছিল ৭ শতাংশ।
এখন আটক বন্দির সংখ্যা পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে অপরাধের রেকর্ড নেই এমন অভিবাসীদের আটকের হার আবারও সবচেয়ে বেশি বাড়ছে। মে থেকে জুনের মধ্যে অপরাধের রেকর্ডহীন বন্দির সংখ্যা ৩ শতাংশ এবং অপরাধের রেকর্ড থাকা বন্দির সংখ্যা ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও, জুলাইয়ের প্রথম ১১ দিনের উপাত্তে বড় ধরনের লাফ দেখা গেছে। জুনের তুলনায় জুলাইয়ে অপরাধের রেকর্ডহীন বন্দির গড় সংখ্যা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২২,০০০ থেকে ২৬,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে অপরাধে দণ্ডিত ও বিচারাধীন মামলা থাকা বন্দির সংখ্যা বেড়েছে ৫ শতাংশ করে।
১১ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, আটক বন্দিদের মধ্যে ২৯ শতাংশের অপরাধের সাজা রয়েছে এবং ৩১ শতাংশের বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে এই সম্মিলিত সংখ্যাটির ওপর জোর দিয়ে হোমান বলেন, "অভিবাসন আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা যাদের গ্রেফতার করছি, তাদের বেশিরভাগই অপরাধী। বামপন্থীরা এ নিয়ে মিথ্যাচার করছে।"

