প্রশ্ন ফাঁস বিতর্ক: মোদির আশ্বাসের পরও ভারতে ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন অব্যাহত

ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি নিয়ে দেশজুড়ে চলমান তীব্র বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তবে তার এই আশ্বাসের পরও শান্ত হয়নি রাজপথ। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নরেন্দ্র মোদি বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। গত আড়াই মাসে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের একটি বছরও যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য ২২ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দ্রুত নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোদি জানান, জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের কাজ চলছে এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। এছাড়া, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ আমলাকে অন্য বিভাগে বদলি করা হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে মোদি কোনো মন্তব্য করেননি।

মোদির এই প্রতিশ্রুতি এমন এক সময়ে এলো যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর নেতৃত্বে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নয়াদিল্লিতে বড় ধরনের সমাবেশ করেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদি তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এটিই তার সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে গত ১৬ মে এই দলটির সূচনা করেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (যিনি মোদির মিত্র হিসেবে পরিচিত) আন্দোলনকারী ও বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ এবং ‘সমাজের পরজীবী’ বলে মন্তব্য করার পর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত দিপকে অনলাইনে এই প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্মটি গড়ে তোলেন।

সিজেপি মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, দেশ এর আগেও অনেক ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতের ঘোষণা দেখেছে, কিন্তু এটি শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংকটের সমাধান নয়। মোদির উচিত ব্যবস্থার সংস্কার করা, ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অপসারণ করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। বিক্ষোভকারী ২৩ বছর বয়সী আরোহী সিং জানান, তার বোনকে আবারও পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়েছিল কিন্তু সে পাস করতে পারেনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রধানমন্ত্রী কেন স্রেহ শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে পারছেন না?

নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গত সোমবার পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করলে তীব্র সংঘর্ষ হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অনুমতি দিতে এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা থেকে বিরত থাকতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ২২ বছর বয়সী কনটেন্ট ক্রিয়েটর কৌশল মালিক জানান, তার পরিবার নিরাপত্তার কারণে উদ্বিগ্ন থাকা সত্ত্বেও তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা ১৭ বছর বয়সী ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থী কুনাল সূর্যবংশী বলেন, তিনি এখানে এসেছেন একটি পরিবর্তনের আশায়।

এদিকে, বিরোধী দলগুলো এই ইস্যুতে পার্লামেন্ট উত্তাল করে রেখেছে এবং সোমবার পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনায় মোদির ক্ষমা দাবি করেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এক পোস্টে মোদির সমালোচনা করে বলেন, আপনি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন এবং এর জন্য দায়ীদের রক্ষা করছেন। অন্যদিকে, লাদাখের বিশিষ্ট সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক, যিনি এই আন্দোলনের সমর্থনে গত ২৮ জুন থেকে অনশন করছিলেন, তিনি মধ্যরাতের পর অনশন ভাঙার ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘ আলোচনার পর দেশে সম্ভাব্য সহিংসতা এড়াতে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।

ভারতের এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশেও বিক্ষোভ হয়েছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, একদল শিক্ষার্থী মশাল মিছিল বের করে। ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক রফিকুজ্জামান ফরিদ বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ, দুর্নীতি ও প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ভারতীয় শিক্ষার্থীদের প্রতি তারা পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করছেন।