ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলন এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রমাগত চাপের মুখে নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। আন্দোলনরত ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিনিধিদের সঙ্গে যেকোনো সময় আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে কেন্দ্র। সরকারের পক্ষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের সুবিধাজনক সময়ে সরকার এই আলোচনা করতে প্রস্তুত। কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে থাকবেন আরেক মন্ত্রী জেপি নাড্ডা। নাড্ডার বাসভবন বা কার্যালয়ে এই বৈঠক হতে পারে জানিয়ে সিজেপি ও আন্দোলনকারীদের প্রতি বিনীত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, আলোচনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে একটি সুষ্ঠু সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব এবং এটি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সরকারের নেওয়া ধারাবাহিক পদক্ষেপেরই অংশ।
তবে সরকারের এই আলোচনার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি)। তাদের পক্ষ থেকে সৌরভ দাস সাফ জানিয়েছেন, তারা কোনো মন্ত্রীর ব্যক্তিগত বাড়ি বা কার্যালয়ে বৈঠকে যাবেন না। তিনি বলেন, গণদরবার যন্তর মন্তরেই হওয়া উচিত এবং মন্ত্রীদের জনগণের মাঝে এসে কথা বলা প্রয়োজন। দাস আরও যোগ করেন, সিজেপি আলোচনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তবে মন্ত্রীদের যদি কোনো নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থাকে, তবে বিক্ষোভ স্থলের কাছাকাছি কোনো নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে, একদিকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের দমনপীড়ন চালানো হচ্ছে অভিযোগ করে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তারা এখনো অনড় রয়েছে।
এদিকে নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে সংসদে আলোচনার ব্যাপারেও সম্মতি প্রকাশ করেছে মোদি সরকার। লোকসভায় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়েছেন, আলোচনার সময় ও স্থায়িত্ব বিরোধীরাই নির্ধারণ করুক, তবে আলোচনার জন্য কোনো পূর্বশর্ত দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের তরুণদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, তরুণদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত কঠোর শাস্তি দিতে একটি ‘ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস।
প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তার পর তীব্র সমালোচনা করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তিনি অভিযোগ করেন, মোদি নিজেই দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছেন এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে দায়ীদের রক্ষা করছেন। রাহুল গান্ধী সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে অপসারণসহ তিন দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে বৃহস্পতিবারও উত্তপ্ত ছিল ভারতের সংসদ চত্বর। সকালে সংসদের মকর দ্বারের সামনে সোনিয়া গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী দলের এমপিরা শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা চেয়ে স্লোগান দেন। পাল্টা বিক্ষোভে এনডিএ’র এমপিরা অভিযোগ করেন, রাহুল গান্ধী রাজনৈতিক স্বার্থে তরুণদের উসকানি দিচ্ছেন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে তেলাপোকা জনতা পার্টির ধরনা কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে। বুধবার রাতে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের হামলার পর দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে তরুণ-তরুণীরা এসে সমাবেশে যোগ দিচ্ছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দিল্লির ১৬টি মেট্রো স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপক জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার তাদের আন্দোলনের ৩৪তম দিন এবং সোনম ওয়াংচুকের অনশনের ২৬তম দিন চলছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তবে সোনম ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। সোনম সরকার বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছেন, ২০শে জুলাইয়ের সংসদ অভিযানে অংশ নেওয়া শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যেন কোনো আইনি ব্যবস্থা বা হেনস্তা না করা হয়। সরকারের কাছ থেকে এই আশ্বাস পেলে তিনি অনশন ভাঙবেন।
তেলাপোকা জনতা পার্টির এই আন্দোলন এখন ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। পুলিশের বর্বরতার প্রতিবাদে শুক্রবার দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে সিজেপি। কলকাতায় একটি মিছিলের জন্য পুলিশের অনুমতি চাওয়া হয়েছে এবং গত কয়েক দিনে মুম্বই ও চেন্নাইসহ বিভিন্ন শহরে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি বিজেপির আদর্শিক অভিভাবক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘও (আরএসএস) শিক্ষার্থীদের ওপর দিল্লি পুলিশের আগ্রাসী ভূমিকার সমালোচনা করেছে। আরএসএস নেতৃত্বের মতে, নিট প্রশ্নফাঁস ও সিবিএসই পরীক্ষার জটিলতায় শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক। পরিস্থিতি এতটা জটিল হওয়ার আগেই সরকারের উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসা। তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি আরএসএস।

