মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলোকে একটি ‘প্রতারণা’ বা ‘হোক্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। দ্রুত অগ্রসরমান এই প্রযুক্তির জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষাকবচ বা কড়াকড়ি আরোপের আহ্বানের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি।
এর আগে অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক বিবিসিকে জানিয়েছিলেন যে, ইন্ডাস্ট্রি পর্যায়ে একটি ‘কিল সুইচ’ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন, যা তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হবে। এআই প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন নির্বাহী ও কর্মীর পক্ষ থেকে প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তা আসার পর ক্লার্ক এই মন্তব্য করেন। এসব উদ্বেগের কারণে প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বাজারে দরপতনও লক্ষ্য করা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধারাবাহিক পোস্টে ট্রাম্প এই এআই সতর্কতাকে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং স্ক্যাম’ বা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতারণার সাথে তুলনা করেছেন। তিনি নিজেকে ‘হোক্স বাস্টার’ বা প্রতারণা উদঘাটনকারী হিসেবে দাবি করে বলেছেন, এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগগুলো অনেকটা ‘রাশিয়া রাশিয়া রাশিয়া’ প্রতারণার মতোই। ট্রাম্পের মতে, এআইয়ের জন্য একমাত্র প্রয়োজনীয় ‘সুরক্ষাকবচ’ হলো একজন ‘শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান’ প্রেসিডেন্ট।
তিনি আরও দাবি করেন, এআই এবং ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে একটি ‘অসুস্থ ষড়যন্ত্র’ চলছে, যার ফলে কেবল চীনই লাভবান হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, “যে এআই জিতবে, সেই বিজয়ী হবে।” এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে চীনের দ্রুত এআই উন্নয়নের কারণে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ তাদের নীতি নির্ধারণকে প্রভাবিত করছে। ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক শিন চিয়াং গ্লোবাল টাইমসকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এআই উন্নয়ন ধীর করে দেয় বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তবে চীন আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।
জ্যাক ক্লার্ক তার মন্তব্যের প্রেক্ষিতে সোমবার বলেন, এআই সফটওয়্যার যদি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে তবে তা পুরোপুরি বন্ধ করার একটি উপায় থাকা উচিত এবং সমাজ হয়তো ভবিষ্যতে এ নিয়ে নিয়ম তৈরি করবে। তিনি জানান, অ্যানথ্রোপিকসহ বেশিরভাগ ল্যাবে প্রযুক্তি বন্ধ করার ব্যবস্থা রয়েছে, তবে আইনপ্রণেতাদের এটি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সচিব জোনাথন রেনল্ডস মঙ্গলবার বিবিসিকে বলেছেন, এআইয়ের প্রভাব নিয়ে কখনোই আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়, তবে অতিরঞ্জিত ভয় থেকেও সতর্ক থাকতে হবে। তিনি এআইয়ের ঝুঁকি স্বীকার করার পাশাপাশি জনসেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনীতিতে এর বিশাল অবদানের কথা তুলে ধরেন।
এদিকে মাইক্রোসফট এআইয়ের প্রধান নির্বাহী মোস্তফা সুলেমান জানিয়েছেন, তারা ‘হিউম্যানিস্ট এআই’ নিয়ে কাজ করছেন এবং চলমান বিতর্কের প্রেক্ষিতেই নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিতব্য ‘প্রো-হিউম্যান অ্যাসেম্বলি’তে স্টিভ ব্যানন এবং বার্নি স্যান্ডার্স এআই নীতি পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানাবেন। স্যান্ডার্স গত সপ্তাহে বিবিসিকে বলেছিলেন, এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি থামাতে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে।
অ্যানথ্রোপিকের প্রাক্তন গবেষক জ্যাকব কক্সনের একটি ভাইরাল পোস্টের পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় অ্যানথ্রোপিক বিজ্ঞানী ইভান হুবিঙ্গার মন্তব্য করেছেন যে, পরবর্তী এক দশকে এআইয়ের কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি। অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদি বাণিজ্যিক সুবিধা বিসর্জন না দিয়ে এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে আনার এবং নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআইয়ের ইলন মাস্কও এআই খাতের এই ধীরগতি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সাথে একমত পোষণ করেছেন।

