জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ইউরোপে মশার বংশবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হচ্ছে। এর ফলে ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের সংক্রমণ দীর্ঘ সময় ধরে এবং নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। চলতি বছর ইতালিতে এখন পর্যন্ত ৬৫০ জনেরও বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, যা সমগ্র ইউরোপে শনাক্ত হওয়া মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক।
ইতালির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (আইএসএস)-এর গবেষক আন্তোনিনো বেল্লা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় মশার প্রজনন ক্ষমতা বাড়ছে এবং সংক্রমণ ছড়ানোর সময়সীমা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এতে মানুষের শরীরে এই ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ২০২০ সাল থেকে ইতালিতে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসটি একটি স্থায়ী রোগ (এনডেমিক) হিসেবে রূপ নিয়েছে। প্রতি বছর গ্রীষ্মের শেষ ভাগে এবং শরতের শুরুতে এই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা যায়।
আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশের শরীরে কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। বাকিদের ক্ষেত্রে মৃদু জ্বরের মতো লক্ষণ দেখা দেয়। তবে বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকেই শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এমন অল্প কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক স্নায়বিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। গবেষকরা বলছেন, চলতি বছরের আক্রান্তের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর কাছাকাছি হলেও উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে মশার বংশবৃদ্ধি সহজ হওয়ায় এই সংক্রমণ নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। যেসব এলাকায় আগে এই ভাইরাসের উপস্থিতি ছিল না, সেখানেও এখন নতুন করে সংক্রমণ ধরা পড়ছে।
ইতালির এই পরিস্থিতি এখন উত্তর ইউরোপের দেশগুলোরও নজর কাড়ছে। বেলজিয়ামের একটি গবেষক দল গত মে মাসে ইতালির আইএসএস পরিদর্শন করে তাদের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেছে। এছাড়া নেদারল্যান্ডসেও চলতি বছর দুই ডজনেরও বেশি মানুষ ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং কয়েকজন মারা গেছেন, যা ২০২০ সালের পর দেশটিতে প্রথম সংক্রমণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ইউরোপীয় কার্যালয়ের প্যান্ডেমিক থ্রেটস বিভাগের প্রধান মার্ক-অ্যালাইন উইডোসন বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ভাইরাস ও এর বাহক মশার বংশবিস্তারের সময়সীমা বৃদ্ধি পাবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে জলবায়ু পরিবর্তনই এর একমাত্র কারণ নয়। উষ্ণ আবহাওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের হ্রাস এবং ভূমির ব্যবহারের পরিবর্তনও মশার উপদ্রব বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে পাখির বৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় যেসব পাখি ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করে, তাদের সংখ্যা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতালির শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা মশা, পাখি, রক্তদাতা এবং মানুষের সংক্রমণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলেই সেখানে বিপুল সংখ্যক আক্রান্ত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
ইউরোপীয় সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল (ইসিডিসি) গত জুন মাসে সতর্কবার্তা দিয়েছিল যে, ইউরোপে ঘনঘন তাপপ্রবাহ এবং বন্যার কারণে এডিস অ্যালবোপিকটাস ও এডিস ইজিপ্টাইয়ের মতো ক্ষতিকর মশার প্রজাতিগুলোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ডেঙ্গু, ইয়োলো ফিভার, চিকুনগুনিয়া ও জিকার মতো রোগ ছড়ানো এডিস ইজিপ্টাই মশা ২০২২ সাল থেকে সাইপ্রাসে স্থায়ীভাবে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, এক দশক আগে এডিস অ্যালবোপিকটাস মশা ইউরোপের ৮টি দেশের ১১৪টি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও, চলতি বছর তা ১৩টি দেশের ৩৩৭টি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

