ফ্রান্সে জেন জি বা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলন পুরো দেশকে তোলপাড় করে তুলেছে। এই আন্দোলনকে প্রকাশ্যে উদযাপন করে দেশের ভোটাধিকারের বয়স কমিয়ে ১৬ বছর করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনী বা বাছাইমূলক ভর্তিপ্রক্রিয়া বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন ফরাসি চরম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জাঁ-লুক মেলঁশো। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় ক্লেরমোঁ-ফেরোঁ শহরে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় হাজার হাজার সমর্থকের সামনে ভাষণ দেওয়ার সময় ৭৫ বছর বয়সী এই অ্যান্টি-ক্যাপিটালিস্ট নেতা তাঁর প্রচারণা জোরদার করেন। আগামী বছরের এপ্রিল ও মে মাসে ফ্রান্সে দুই ধাপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা তাঁর চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াই।
রোববারের ওই নির্বাচনী সমাবেশে মেলঁশো আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মঞ্চে ডেকে নেন এবং প্রশংসায় ভরিয়ে দেন। তিনি বলেন, তরুণদের এই প্রতিবাদ আন্দোলন উচ্চমানের রাজনৈতিক ও ইউনিয়নভিত্তিক পরিপক্বতার প্রমাণ দিচ্ছে। মূলত জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, তীব্র শিক্ষক সংকট এবং পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্যের প্রতিবাদে দেশজুড়ে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামে। এই আন্দোলন অনেক জায়গায় সহিংস রূপ নেয়, যার ফলে পুলিশ এখন পর্যন্ত ৬,৬০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। সংঘর্ষে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্যসহ শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। আগামী মঙ্গলবার এবং পরবর্তী শনিবারেও নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ফরাসি সরকার জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ এবং ক্লাসের সময়সূচিতে পরিবর্তনের পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে ব্যারিকেডে থাকা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই পদক্ষেপ পর্যাপ্ত নয়। পূর্ব প্যারিসের একটি স্কুলের গ্রন্থাগারিক দুনিয়া জর্জওঁ বার্তা সংস্থা এপি-কে জানান, এই আন্দোলন রাজনৈতিক অঙ্গনে তরুণদের প্রবেশের বার্তা দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশের কঠোর মনোভাব শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। সমালোচকরা মেলঁশো ও তাঁর দল ‘ফ্রান্স আনবাউড’-এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ তুললেও, মেলঁশো তা অস্বীকার করে বলেন, তাঁর দল এই আন্দোলন পরিচালনা করছে না এবং তাঁরা একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চান।
শিক্ষার্থীদের দাবির পাশাপাশি বয়স্ক ভোটারদের টানতে অবসর গ্রহণের বয়স ৬২ থেকে কমিয়ে ৬০ বছর করার প্রস্তাব দেন মেলঁশো। একই সঙ্গে ফ্রান্সের ওপর চেপে বসা বিপুল পরিমাণ ঋণ বাতিলের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। জ্ঞানকে পণ্য বানানো উচিত নয় উল্লেখ করে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্ল্যাটফর্মের কঠোর সমালোচনা করেন। আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মেলঁশো আমেরিকার শুল্ক নীতির কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রতিপক্ষ হিসেবে আখ্যা দেন এবং নেটো ও বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে ফ্রান্সকে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের আহ্বান জানান।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করছেন এবং সংবিধান অনুযায়ী তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ফলে ইউরো অঞ্চলের অন্যতম মূল স্তম্ভ, দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ফ্রান্সের আগামী নির্বাচনকে পুরো ইউরোপের জন্য একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মেলঁশো ও মধ্য-ডানপন্থী প্রার্থী এদুয়ার্দ ফিলিপ উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লুপেনের পেছনে থাকলেও অন্যান্য প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। এদিকে উইকেন্ডে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার্দ ফিলিপ এবং গ্যাব্রিয়েল আতাল আলাদা জনসভা করেছেন। অন্যদিকে রোববার ফ্রান্সের সোশ্যালিস্ট ও তাঁদের সহযোগীরা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতা রাফায়েল গ্লুকসম্যানকে তাঁদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন, যদিও সাইবার হামলা ও দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনে পুরো প্রাথমিক প্রক্রিয়াটি কিছুটা বিঘ্নিত হয়।

