হামাস নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনায় সম্মত হওয়ার কয়েক দিনের মাথায় গাজা উপত্যকায় টানা দ্বিতীয় রাতের মতো বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজা সিটি, খান ইউনিস এবং দেইর আল-বালাহতে চালানো এই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। গাজার সিভিল ডিফেন্স অথরিটি জানিয়েছে, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো এই হামলা পরিচালনা করেছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবনে হামলায় এক শিশুসহ দুজন নিহত হয়েছেন। উত্তর গাজার জাবালিয়ার কাছে অন্য এক হামলায় আরও একজন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া খান ইউনিসে একটি বাড়িতে হামলায় এক বাবা, মা এবং তাদের নয় বছর বয়সী ছেলে নিহত হয়েছেন।
দেইর আল-বালাহতে একটি বহুতল আবাসিক ভবনে হামলায় এক পুরুষ ও এক নারী মারা গেছেন। গত বছরের অক্টোবরে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১,১০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা গাজায় সামরিক অপারেটিভদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং এতে দুই হামাস যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে আইডিএফ দাবি করে, তারা হামাসের দুজন কমান্ডারকে হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে একজন এলিট নুখবা বাহিনীর এবং অন্যজন মাগাজি ব্যাটালিয়নের সদস্য।
এছাড়া গত সপ্তাহে উত্তর গাজার জাবালিয়া ব্যাটালিয়নের আরেক হামাস যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করেছে তারা। আইডিএফের দাবি, এই তিনজনই ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করছিলেন।
এই হামলাগুলো এমন এক সময়ে চালানো হলো, যার মাত্র কয়েক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠিত 'বোর্ড অব পিস'-এর কাছে অস্ত্র হস্তান্তরের মাধ্যমে নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছিল হামাস। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি কর্মকর্তা কোহেন মন্তব্য করেছেন, হামাস যদি নিরস্ত্রীকরণ না করে, তবে গাজা উপত্যকাকে ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া প্রয়োজন—যদিও বোর্ড অব পিস-এর পরিকল্পনায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে, গাজায় হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর 'সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ'-এর বিষয়ে বোর্ড অব পিস একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। গত শুক্রবার ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে ইসরায়েল "খুব খুশি" এবং এটিকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি "বড় পদক্ষেপ" হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে হামাস তাদের অস্ত্র বা গাজার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে কি না, তা নিয়ে ইসরায়েল গভীরভাবে সংশয়ী। ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির এই চুক্তির খসড়াকে "অগ্রহণযোগ্য" বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে তৈরি ২০ দফার যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের অংশ এটি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে উন্মোচিত এই পরিকল্পনায় চুক্তি বাস্তবায়নের তদারকির জন্য বোর্ড অব পিস গঠন, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজা পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে।
গত শুক্রবার প্রকাশিত ১৫ দফার একটি রোডম্যাপে ভারী অস্ত্র, সামরিক উৎপাদন কেন্দ্র, অস্ত্রের গুদাম ও টানেলের তালিকা তৈরি ও সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, যা ইসরায়েলের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি প্রতিশ্রুতি পূরণের ওপর নির্ভরশীল।
অস্ত্রগুলো স্বাধীন টেকনোক্র্যাটদের সমন্বয়ে গঠিত 'ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল কমিটি'র ব্যবস্থাপনায় থাকবে, যা বর্তমানে কায়রো থেকে কাজ করছে এবং এখনও গাজায় প্রবেশ করেনি।
এদিকে বিবিসি ভেরিফাই-এর বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েল তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ১,৫০০-এর বেশি ভবন ধ্বংস করেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় প্রায় ৬ কোটি টন ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করছে হামাস, যাকে যুক্তরাজ্য সরকার সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে।

