তুরস্কের একটি বন্দরে কয়লাবাহী জাহাজে কোকেন পাওয়ার ঘটনায় কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ফিনিশ-সিরীয় নাবিক আলী আলবোখারীকে। তাঁর মুক্তির জন্য দীর্ঘ দিন ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর স্ত্রী এলেনা আলবোখারী। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নাবিকদের নিরাপত্তা ও অধিকারের চরম লঙ্ঘনের এক জলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন ‘ফিনিসিয়ান এম’ নামের ১৮০ মিটার দীর্ঘ একটি মালবাহী জাহাজ কলম্বিয়ার বারানকুইলা বন্দরে নোঙর করে। সেখানে জাহাজে তল্লাশি চালিয়ে ১৩৭ কেজি কোকেন উদ্ধার করে কলম্বিয়ার নৌসেনারা। তবে কলম্বিয়ার বন্দর কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র পাওয়ার পর জাহাজটি তুরস্কের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু ২০২৩ সালের ২ অক্টোবর তুরস্কের এরেগলি বন্দরে পৌঁছানোর পর তুর্কি মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা জাহাজটিতে আবার অভিযান চালান।
জাহাজের ক্রোয়াট ক্যাপ্টেন মার্কো বেকাভাক আগেই কলম্বিয়ার ঘটনাটি জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাকে জানিয়েছিলেন এবং তুর্কি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেন। তা সত্ত্বেও কয়লার স্তূপের নিচে লুকানো আরও কোকেন পাওয়ার দাবি করে তুর্কি পুলিশ। এরপর জাহাজের ২০ জন ক্রুর মধ্যে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তুরস্কের একটি আদালত রায় ঘোষণা করে। অন্য আটজন ক্রু খালাস পেলেও ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা নেতৃত্বের দায় চাপিয়ে জাহাজের প্রধান সহকারী (চিফ মেট) আলী আলবোখারী এবং ক্যাপ্টেন বেকাভাককে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৩ হাজার পাউন্ড জরিমানা পরিশোধ না করার অজুহাতে এই সাজা বাড়িয়ে ৩৩ বছর করা হয়।
তবে এই মামলার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। আলীর সহকর্মী ক্যাপ্টেন বেকাভাককে মুক্ত করতে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি কূটনৈতিক তৎপরতা চালান। ফলে ২০২৫ সালের আগস্টে এক রহস্যময় বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে বেকাভাক মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে যান। অভিযোগ রয়েছে, রাশিয়ার ওয়ান্টেড এক তুর্কি বিলিয়নেয়ার মুস্তফা ইগিত জেরেনের বিনিময়ে ক্রোয়েশীয় কূটনীতিকরা বেকাভাককে ছাড়িয়ে নেন।
কিন্তু ফিনল্যান্ড সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় আলী এখনো তুরস্কের কারাগারে বন্দি। ফিনল্যান্ডের কনস্যুলার সার্ভিসের মহাপরিচালক জুসি ট্যানার এই বিষয়টিকে "উদ্বেগজনক" বলে স্বীকার করলেও আলীর মুক্তির বিষয়ে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি।
মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাট সি ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড হ্যামন্ড এই মামলাটিকে "বিচারের চরম প্রহসন" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, তুর্কি পুলিশ কলম্বিয়ার ঘটনার কোনো নথিপত্র সংগ্রহ করেনি, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দি নেয়নি এবং ক্রুদের সাথে মাদকের সম্পৃক্ততার কোনো ফরেনসিক প্রমাণও আদালতে হাজির করতে পারেনি।
তুরস্কের সুপ্রিম কোর্ট অব আপিল ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ৩-২ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আলীর সাজা বহাল রাখে। তবে ভিন্নমত পোষণকারী দুই বিচারক তদন্তের দুর্বলতা এবং কলম্বিয়ার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন।
হেলসিঙ্কির একটি ফ্ল্যাটে বসে স্বামী আলীর ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন তাঁর স্ত্রী এলেনা। তিনি বলেন, "কারাগারে ও খুব দুর্বল ও হতাশ হয়ে পড়েছে।" স্বামীর পাঠানো দুটি পোষা পাখি নিয়ে একা একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি তুর্কি প্রসিকিউটর সুপ্রিম কোর্টে একটি আপিল আপত্তি জমা দিতে সম্মত হয়েছেন, যা আলীর মামলাটি পুনরায় পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এলেনা ও আলীর জীবন এক অনিশ্চয়তায় ঝুলে রয়েছে।

