মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য ও চিকিৎসকদের অবহেলার শিকার হওয়ার এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। গ্যালাপ এবং মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের নেতৃত্বাধীন সংস্থা 'পিভোটাল'-এর যৌথ জরিপে দেখা গেছে, দেশটির অর্ধেকেরও বেশি নারী (৫১%) গত পাঁচ বছরে চিকিৎসা সেবা পেতে নানা ঝামেলার মুখোমুখি হয়েছেন। এছাড়া প্রতি তিনজনে একজন নারী মনে করেন, চিকিৎসকেরা তাদের শারীরিক কষ্ট বা লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেননি বা এড়িয়ে গেছেন।
আরকানসাসের লিটল রকের বাসিন্দা তিন সন্তানের জননী নাইড্রিয়ানা রেইনস এমনই এক অবহেলার শিকার। নানী ও বাবাকে হারানোর পরপরই তিনি গর্ভবতী হন এবং চরম মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকেন। একটি স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসকের কাছে মানসিক সহায়তার জন্য আবেদন করলেও তার চিকিৎসক বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। রেইনসকে বলা হয়, এটি কেবলই সাময়িক বা "ঋতুভিত্তিক বিষণ্ণতা" এবং দ্রুতই কেটে যাবে। তাকে কোনো ওষুধ বা থেরাপির পরামর্শ দেওয়া হয়নি।
রেইনস বলেন, "তারা আমাকে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কোনো সেবা বা ওষুধের সুপারিশ করেনি, কিছুই করেনি।" ২০২০ সালের নভেম্বরে ছেলে জ্যাকসনের জন্মের পর তার এই বিষণ্ণতা আরও তীব্র রূপ নেয়। মানসিক চাপ ও গৃহহীনতার কারণে একপর্যায়ে রেইনসের বুকের দুধ তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং তাকে বাধ্য হয়ে ফর্মুলা কিনতে হয়। পরিস্থিতি এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল যে, নবজাতকের দেখভাল করার জন্য তাকে তার দুই মেয়ে কেহলানি ও নায়লাকে সাময়িকভাবে ফ্লোরিডায় তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতে হয়েছিল। অবশেষে হতাশ হয়ে তিনি পেশাদার চিকিৎসকদের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া বন্ধ করে দেন এবং নিজের পরিবার ও সন্তানের বাবার ওপর ভরসা করেন।
জুলাই মাসে আট দিন ধরে পরিচালিত ৫,২০০ জনেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর গ্যালাপ-পিভোটালের এই জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, নারীদের রোগ নির্ণয়ে পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ পুরুষের রোগ তিন মাসের মধ্যে নির্ণয় করা সম্ভব হয়, সেখানে মাত্র অর্ধেক নারী এত দ্রুত রোগ নির্ণয়ের সুবিধা পান। প্রায় ২৩ শতাংশ নারীকে সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য অন্তত এক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং ৮ শতাংশ নারীকে অপেক্ষা করতে হয়েছে পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময়। শুধু তাই নয়, গত এক বছরে খরচের আশঙ্কায় প্রতি তিনজনে একজন নারী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন বা বিলম্ব করেছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার চারজনে একজন।
গ্যালাপের কাস্টম রিসার্চ বিভাগের প্রধান স্টেফানি মার্কেন বলেন, এই জরিপটি চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিদ্যমান এমন কিছু চ্যালেঞ্জকে সামনে এনেছে যা পুরুষদের চেয়ে নারীদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রকট। তিনি আরও জানান, চিকিৎসকদের চেম্বারে কেবল সিরিয়াল পাওয়াই বড় কথা নয়, বরং চিকিৎসকের সাথে একটি গুণগত সম্পর্ক তৈরি হওয়া জরুরি যা সঠিক রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করে।
সমাজবিজ্ঞানী জেনিফার সিলভা এবং মহামারী বিশেষজ্ঞ অ্যানমেরি হার্শের লেখা নতুন বই "সিন বাট নট হার্ড: ওয়াট মেডিকেল রেকর্ডস ডোন্ট টেল আস অ্যাবাউট উইমেনস লাইভস"-এ এই অবহেলার আরও প্রমাণ পাওয়া যায়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের মিড-আটলান্টিক অঞ্চলের একটি চিকিৎসা ব্যবস্থার ইলেকট্রনিক রেকর্ড এবং সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সাক্ষাৎকারের তুলনা করে দেখেন যে, রোগীরা যা বলছেন আর চিকিৎসকেরা নথিতে যা লিখছেন, তার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ।
গাইসিঙ্গার-জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ এনভায়রনমেন্টাল হেলথ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক অ্যানমেরি হার্শ বলেন, এই যোগাযোগের ঘাটতির কারণে এন্ডোমেট্রিওসিস বা পলিয়েনড্রোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোমের মতো হরমোনজনিত জটিল রোগের সঠিক চিকিৎসা পেতে নারীদের এক দশক বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেক সময় তাদের শারীরিক কষ্টকে মানসিক সমস্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সিলভা একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথা উল্লেখ করে জানান, এক নারীর স্বামী যখন নিজে তার স্ত্রীর ব্যথার বিশদ বিবরণ ও চার্ট নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান, কেবল তখনই চিকিৎসক বিষয়টি বিশ্বাস করেন এবং পরীক্ষার নির্দেশ দেন।
