ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি সংবাদমাধ্যমে খুব একটা বড় খবর হয়ে ওঠেনি। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের মানদণ্ডে তুলনামূলকভাবে কম খবরের সপ্তাহেও এটি তেমন সাড়া ফেলেনি। গত ছয় মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধের মধ্যে ট্রাম্প এতবার এই ধরনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, মানুষ এখন এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই হুমকিগুলোকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া বিপজ্জনক, কারণ তিনি প্রায়শই ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ।
পশ্চিমা নেতা এবং সংবাদমাধ্যমগুলো সাধারণত ট্রাম্পের এই হুমকিগুলোকে তাঁর স্বভাবসুলভ বাগাড়ম্বর বা খামখেয়ালিপনা হিসেবে উড়িয়ে দেয়। তবে এর বাস্তব ও মারাত্মক পরিণতি রয়েছে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে মার্কিন ও পশ্চিমা সমাজ বেসামরিক নাগরিক এবং অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো বড় ধরনের সহিংসতাকে যুদ্ধের একটি বৈধ হাতিয়ার হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। এর পেছনে ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধও ভূমিকা রেখেছে, যা পশ্চিমা বিশ্বকে তীব্র বিমান হামলা, ব্যাপক বেসামরিক হতাহত এবং বাস্তুচ্যুতির মতো নৃশংসতায় অভ্যস্ত করে তুলেছে।
যুদ্ধের শুরুতেই যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো দ্রুত সামরিক বিজয় পাচ্ছে না, তখনই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এই ধ্বংসাত্মক হুমকির পটভূমি তৈরি করেছিলেন। গত ৭ এপ্রিল, যখন তিনি যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়া এবং আরও তীব্র বোমা হামলার আদেশের মধ্যে দোদুল্যমান ছিলেন, তখন ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে একটি ভয়াবহ পোস্ট করেন: "আজ রাতে একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।"
এই বিবৃতির আগের দিনগুলোতে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে না দেয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির অবকাঠামো ধ্বংস করবে। যুদ্ধের শুরুতে তেহরান এই জলপথটি বন্ধ করার আগে বিশ্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল ও তরল গ্যাস এই পথ দিয়েই সরবরাহ হতো। ১ এপ্রিল হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে বোমা মেরে "প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার" হুমকি দেন। এরপর ৬ এপ্রিল তিনি দাবি করেন, ইরানকে "এক রাতেই ধ্বংস করা সম্ভব" এবং আমেরিকার কাছে দেশটির প্রতিটি সেতু ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা অবকাঠামোগুলোকে "জ্বলন্ত ও বিস্ফোরিত অবস্থায় ফেলে রাখবে এবং কখনো ব্যবহার করা যাবে না।" এটি ছিল মূলত যুদ্ধাপরাধ করার সরাসরি ঘোষণা।
ইরানি নেতাদের ট্রাম্পের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য ৭ এপ্রিল পূর্বঞ্চলীয় সময় রাত ৮টা পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ৯ কোটি মানুষের একটি দেশের সভ্যতা মুছে ফেলার হুমকি দেন। এই হুমকি বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং জাতিসংঘের মহাসচিব ও পোপ এর তীব্র নিন্দা জানান। কয়েকজন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ যুক্তি দেখান যে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য জাতিসংঘের গণহত্যা বিষয়ক কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যার হুমকির শামিল হতে পারে, যেখানে কোনো জাতীয়, জাতিগত, ধর্মীয় বা বর্ণগত গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়কে গণহত্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তবে ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যের জন্য কখনো ক্ষমা চাননি বা তা প্রত্যাহার করেননি। বর্তমান বিশ্বে গণহত্যার হুমকি দেওয়া বা তা বাস্তবায়নের জন্য কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় তাঁর ওপর কোনো চাপও ছিল না।
ইরানকে ধ্বংস করার এই হুমকি মূলত গত তিন বছরে গড়ে ওঠা এক নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতিফলন। এই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যাকে সুরক্ষা দিয়েছে। ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে আরও বেশি খামখেয়ালি এবং ক্ষমতার লোভে মত্ত একনায়কের মতো আচরণ করছেন। পশ্চিমা নেতারা গাজা এবং সম্প্রতি লেবাননে ইসরায়েলের রক্তপাত বজায় রাখতে গিয়ে কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক নিয়ম ও আইনের শাসনকে ধ্বংস করে দিয়েছেন, যার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছেন ট্রাম্প।
গাজার মতো করেই বেশিরভাগ পশ্চিমা শক্তি ফিলিস্তিনি, ইরানি ও লেবানিজদের দুঃখ-কষ্টের প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেছে। যতদিন এই উদাসীনতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি বজায় থাকবে, ততদিন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে একটি সম্পূর্ণ সমাজ ও সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দেওয়া স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই গণ্য হবে।
ট্রাম্পকে খামখেয়ালি বা অযৌক্তিক বিশ্বনেতা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া সহজ হলেও, বর্তমান দায়মুক্তির যুগের পথ প্রশস্ত করেছিলেন তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেন। ২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের অনেক আগেই, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে বাইডেন এবং অন্যান্য পশ্চিমা নেতারা আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করেছিলেন।
প্রায় ১৫ মাস ধরে বাইডেন প্রশাসন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে, যাতে ইসরায়েল এবং তার প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় যুদ্ধাপরাধের জন্য কোনো শাস্তির মুখোমুখি না হন। বাইডেনের এই নিষ্ক্রিয়তা আন্তর্জাতিক আইনকে অর্থহীন করে তুলেছে, যার ফলে ট্রাম্প এখন মানবাধিকার বা আইনের শাসনের কোনো তোয়াক্কা না করে সরাসরি মার্কিন সামরিক শক্তির প্রদর্শন করতে পারছেন।
গাজায় ইসরায়েলের নৃশংসতার এই স্বাভাবিকীকরণ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়েছে। গত জুলাই মাসে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, হরমুজ প্রণালীতে ইরান কোনো জাহাজে হামলা চালালে তার প্রতিশোধ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি করে সেতু বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বোমা মারবে। বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে এই ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধ হলেও ট্রাম্পের ক্রমাগত হুমকির কারণে এগুলো এখন যুদ্ধের একটি সাধারণ অংশ বলে মনে হচ্ছে। অন্তত মার্কিন নাগরিক এবং বিশ্ববাসীর উচিত এই বিপজ্জনক প্রবণতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।
নিবন্ধটির লেখক মোহাম্মদ বাজ্জি গার্ডিয়ান ইউএস-এর একজন কলামিস্ট। তিনি নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতার অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর নিয়ার ইস্টার্ন স্টাডিজের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

