দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নানা মতভেদ এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এই জটিল পরিস্থিতিতেও একটি যৌথ ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়েছে জোটটি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতাদের বিশ্বমঞ্চে ‘নিয়ম মেনে চলা’র বদলে ‘নিয়ম তৈরি কারক’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এবারের সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা অংশ নেন। এই দেশগুলোর মধ্যে গভীর দ্বিপাক্ষিক বিরোধ রয়েছে। যেমন, ২০২০ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছিল। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে; এমনকি একে অপরের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
এই বৈরী মনোভাবের নেতাদের এক টেবিলে বসানো ভারতের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। তবে ভারত এই জোটকে কোনোভাবেই পশ্চিমা-বিরোধী ব্লক হিসেবে দেখাতে চায়নি। প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন, এই গ্রুপটি "কারও বিরুদ্ধে নয়"। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও প্রবীণ কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়াত বলেন, ভারত যুদ্ধের এই যুগে "কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন" বজায় রাখতে পেরেছে এবং নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে।
সম্মেলনের প্রথম দিনেই গৃহীত হয় ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’। তবে এই ঘোষণায় অনেক সংবেদনশীল বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ নিয়ে ঘোষণাপত্রে "সর্বোচ্চ সংযম" প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে এবং বেসামরিক অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা করা হলেও কাউকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি। এছাড়া ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাতিচ্যুত করার বিরোধিতা করে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবারের ঘোষণাপত্রে ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো উল্লেখই করা হয়নি, যা পূর্ববর্তী ব্রিকস ঘোষণার তুলনায় একটি বড় ব্যতিক্রম।
বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে ঘোষণাপত্রে শুল্ক বৃদ্ধি এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি নেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষোভ এড়াতেই সদস্য দেশগুলো এই সতর্কতা অবলম্বন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প এর আগে ব্রিকসের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহারের প্রস্তাবকে "আমেরিকা-বিরোধী" বলে অভিহিত করেছিলেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের নিন্দা করলেও কোনো দেশের নাম না নেওয়া ভারতের কূটনৈতিক কৌশলেরই বহিঃপ্রকাশ। তবে শুল্ক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার বিষয়টিতে তিনি অবাক হয়েছেন, যা ভারতের অসন্তোষ প্রকাশের একটি সুযোগ হতে পারে।
সম্মেলনের ফাঁকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ মুখোমুখি বৈঠকে বসেন, যা যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সাক্ষাৎ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ইরান এই সম্মেলনকে কাজে লাগিয়ে মালয়েশিয়া, ভারত ও ইথিওপিয়ার মতো ব্রিকস সদস্যদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর জোর দিয়েছে।
গত সাত বছরের মধ্যে এটিই ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রথম দিল্লি সফর। ২০২০ সালের সীমান্ত বিরোধের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। সম্মেলনে মোদী ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে কুশল বিনিময় ও করমর্দন হলেও মোদীর পরিচিত উষ্ণ কোলাকুলি দেখা যায়নি। শি ২৪ ঘণ্টারও কম সময় দিল্লিতে অবস্থান করেন এবং শনিবার রাতের গালা ডিনার এড়িয়ে যান। তবে দুই নেতা বাণিজ্য বাধা দূর করতে এবং ব্যবসায়িক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরদার করতে সম্মত হয়েছেন। ভারতের সাবেক কূটনীতিক ত্রিগুনায়াত এই সম্পর্ককে ইতিবাচক দেখলেও সতর্ক করে বলেন, "আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, তবে আগে যাচাই করতে হবে।"

