যুক্তরাজ্যের ডোভার ও পোর্টসমাউথ বন্দরে সম্প্রতি মুখোশধারী উগ্রপন্থীদের বিক্ষোভ এবং অনলাইন জগতে মিথ্যা ও বিষাক্ত তথ্যের বিস্তার নিয়ে নতুন এক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার কারণে এই ধরনের চরমপন্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো যৌক্তিক ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি উগ্রপন্থীরা লন্ডনে ‘ডেইলি মেইল’ পত্রিকার কার্যালয়ের সামনেও বিক্ষোভ করেছে, যেখানে তারা তাদের নেতা ড্যানিয়েল "টম্মো" থমাসের মায়ের জন্য নতুন একটি বাড়ির দাবি জানায়।
টিকটকের মতো দ্রুতগতির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ মাত্র ৩৫ মিনিটে প্রায় ২৬০টি ভিডিও স্ক্রোল করে পার করে দিতে পারে। এই বিভ্রান্তিকর ও দ্রুতগতির তথ্য গ্রহণের অভ্যাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জনমতেও। সম্প্রতি ইউগভ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের ৫৩ শতাংশেরই ডোভার ও পোর্টসমাউথের মুখোশধারী বিক্ষোভগুলো "প্রতিবাদের বৈধ উপায়" কি না, তা নিয়ে কোনো মতামত নেই। সামগ্রিকভাবে সব বয়সীদের ৪৩ শতাংশ এই ঘটনা সম্পর্কে জানতেনই না বা খেয়াল করেননি। অথচ এই বিক্ষোভকারীদের কালো পোশাক ও মুখোশ ওল্ডওয়াল্ড মোসলের ব্ল্যাকশার্ট, হিটলারের নাৎসি বাহিনী কিংবা কু ক্লাক্স ক্ল্যানের (কেকেকে) উগ্রবাদের কথাই মনে করিয়ে দেয়, যা ইতিহাস সচেতন পাঠকদের কাছে স্পষ্ট।
দ্য টাইমস-এর কলামিস্ট জেমস ম্যারিয়ট তার নতুন বই 'দ্য নিউ ডার্ক এজেস: দ্য এন্ড অব রিডিং অ্যান্ড দ্য ডন অব এ পোস্ট-লিটারেট সোসাইটি'-তে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছেন। ২০৮ পৃষ্ঠার এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু জরুরি বইটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে সমাজ একটি উত্তর-সাক্ষর যুগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল লিটারেসি ট্রাস্টের গত ২০ বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, অবসরে বই পড়ে আনন্দ পাওয়ার হার শিশুদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ কমে ইতিহাসে সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছে। ২০২৪ সালে দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত রিডিং এজেন্সি চ্যারিটির এক জরিপ অনুযায়ী, ৩৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখন আর অবসরে বই পড়েন না।
দি আটলান্টিক সাময়িকীতে রোজ হোরোউইচ তার 'দ্য এন্ড অব রিডিং ইজ হিয়ার' প্রবন্ধে লিখেছেন, "সাক্ষরতার যুগটি হয়তো মৌখিক ও ডিজিটাল যুগের মধ্যবর্তী একটি সংক্ষিপ্ত সময় হিসেবে প্রমাণিত হবে।" যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ হাইস্কুল শিক্ষার্থী বই পড়াকে একটি 'অсмотря বা ভিনগ্রহের অভ্যাস' বলে মনে করে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ৩২০টিরও বেশি সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে মানুষ এখন কোনো খবর ছাড়াই জীবন পার করে দিতে পারছে।
বই পড়ার এই অনীহার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিথ্যা ও চরমপন্থা ছড়ানো সহজ হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদাহরণ টেনে জেমস ম্যারিয়ট লিখেছেন, ট্রাম্প কোনো মেমো বা নথিপত্র পড়েন না। তার বক্তব্য দেওয়ার শৈলীও অ-সাক্ষর প্রকৃতির, যেখানে কোনো বিশ্লেষণাত্মক যুক্তি ছাড়াই একের পর এক দাবি ছুড়ে দেওয়া হয়। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ৫,০০০ ডলারের নির্বাচনী উপহার বা তার বর্তমান পরিবহন সচিব শন ডাফির গাড়ির স্টার্ট-বাটন বাতিলের পক্ষে অদ্ভুত যুক্তি এর বড় উদাহরণ। ম্যারিয়ট লিখেছেন, "গণসাক্ষরতা ও গণগণতন্ত্র দুটিই সাম্প্রতিক বিষয়। একটিকে ছাড়া অন্যটি টিকে থাকতে পারবে কি না, তা আমরা জানি না।"

