নিউ ইয়র্কের অত্যন্ত জনপ্রিয় মেক্সিকান ট্যাকো জয়েন্ট 'লস ট্যাকোস নং ১' ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করার পর দ্রুতই শহরের খাদ্যপ্রেমী ও সমালোচকদের মন জয় করে নেয়। হাতে তৈরি নরম টরটিয়া আর রসালো আল পাস্তুরের স্বাদে মুগ্ধ হয়ে মানুষ এখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত। দারুণ জনপ্রিয়তার জেরে চেইনটি নয়টি শাখায় সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি যখন 'টিএসজি কনজিউমার' নামক একটি প্রাইভেট ইকুইটি (পিই) ফার্ম থেকে অনুদঘাটিত অংকের তহবিল পাওয়ার ঘোষণা দেয়, তখন থেকেই শুরু হয় বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রাহকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে এটিকে এই চেইনের "পতনের শুরু" বলে অভিহিত করেন। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এখন থেকে খাবারের পরিমাণ কমে যাবে এবং মান খারাপ হবে।
গ্রাহকদের এমন আশঙ্কার মুখে লস ট্যাকোস নং ১-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতারা আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, তারা গুয়াকামোলির জন্য বাড়তি টাকা নেবেন না বা ট্যাকোর স্বাদে কোনো পরিবর্তন আনবেন না। তবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দাদের ক্ষোভ তাতে কমেনি। শহরের ঐতিহ্যবাহী ও সৃজনশীল রেস্টুরেন্টগুলো ক্রমান্বয়ে কর্পোরেট রূপ ধারণ করায় অনেকেই এর পেছনে মূল খলনায়ক হিসেবে দেখছেন প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মগুলোকে। সাধারণত এই ফার্মগুলো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে সেটির পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নেয়। বর্তমানে হাসপাতাল, ভেটেরিনারি ক্লিনিক থেকে শুরু করে পোশাক ও ছুরি-কাঁচির ব্র্যান্ডের পর এবার মানুষের অন্যতম প্রিয় শখ 'বাইরে খাওয়া-দাওয়া'র ওপরও থাবা বসাচ্ছে এই কর্পোরেট পুজিঁ।
রেস্টুরেন্ট কর্মী-মালিক ও লেখক জয়া সাক্সেনার মতে, প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মগুলো মূলত এমন সব রেস্টুরেন্ট বেছে নেয় যেখানে কম খরচে সহজে খাবার তৈরি করা যায়। কুকি, ব্যাগেল বা আইসক্রিমের মতো খাবার বিক্রির জন্য কোনো পেশাদার শেফের প্রয়োজন হয় না। ফলে খুব সহজেই হিমায়িত খাবার ওভেনে গরম করে বা আইসক্রিম স্কুপ করে গ্রাহকদের পরিবেশন করা যায়। ওয়েস্ট ভিলেজের 'মাইকাস' গ্রিক ইয়োগার্ট বা ফিলাডেলফিয়ায় 'ব্ল্যাঙ্ক স্ট্রিট কফি'র নতুন আউটলেটে মানুষের দীর্ঘ লাইন এর বড় উদাহরণ, যার উভয়ই পিই ফার্মের অর্থায়নে চলে।
তবে সচেতন গ্রাহকেরা এই ধরনের রেস্টুরেন্ট থেকে দূরে থাকছেন। তাদের মতে, পিই-অর্থায়িত রেস্টুরেন্টগুলো খরচ কমাতে গিয়ে খাবারের মান কমিয়ে দেয় এবং যান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে কোনো স্থানীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া থাকে না। ক্যাশিয়ারের বদলে সেখানে থাকে টাচস্ক্রিন অর্ডার সিস্টেম এবং খাবারের দাম এতটাই বেশি থাকে যে গ্রাহকদের আফসোস করতে হয়। সম্প্রতি টিকটকে '@thedilligentdiva' হ্যান্ডেলের এক ব্যবহারকারী নিউ ইয়র্কের এমন পিই-সমর্থিত রেস্টুরেন্টগুলোর একটি তালিকা শেয়ার করে বলেন, "একটি আকাই বোলের (acai bowl) জন্য ২০ ডলার অপচয় করবেন না।" তিনি নিজে 'পুরা ভিদা' নামক একটি জায়গায় ২০ ডলারের অত্যন্ত নিম্নমানের ও অতিরিক্ত মিষ্টি আকাই বোল খাওয়ার পর এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
টিকটকে অনেকেই এই ট্রেন্ডে শামিল হয়ে স্বাধীন ও পারিবারিক মালিকানাধীন (মম অ্যান্ড পপ) রেস্টুরেন্ট খুঁজে পাওয়ার সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তারা 'বেলি' নামক একটি রেস্টুরেন্ট ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার করে পিই-অর্থায়িত রেস্টুরেন্টের বিকল্প খোঁজার পরামর্শ দিচ্ছেন। যেমন পিই-পুষ্ট 'পপ আপ ব্যাগেল'-এর বিকল্প হিসেবে তারা 'অ্যাপোলো ব্যাগেলস' বা 'টম্পকিন্স স্কয়ার ব্যাগেলস'-এর নাম প্রস্তাব করেছেন। আবার ফাস্ট-ক্যাজুয়াল চেইন 'ডিগ ইন'-এর বদলে স্বাস্থ্যকর খাবারের দোকান 'দিসবোল'-এর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, যদিও দিসবোল-ও 'স্ট্রাইপস' নামক একটি পিই কোম্পানির আংশিক অর্থায়ন পেয়েছে। এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী ট্যাকো স্পট 'ট্যাকোম্বি' পিই-এর আওতায় চলে যাওয়ার পর মানুষ লস ট্যাকোস নং ১-কে বিকল্প ভাবত, কিন্তু এখন সেটিও কর্পোরেট কবলে চলে গেছে।
'ব্যাড কোম্পানি: প্রাইভেট ইকুইটি অ্যান্ড দ্য ডেথ অব দ্য আমেরিকান ড্রিম' বইয়ের লেখক ও সাংবাদিক মেগান গ্রিনওয়েল বলেন, পিই ফার্মগুলোর মূল লক্ষ্য থাকে যেকোনো উপায়ে মুনাফা বাড়ানো, খাবারের মান রক্ষা করা নয়। মুনাফা বাড়ানোর সহজ উপায় হলো কর্মী ছাঁটাই করা, স্টাফ কমানো অথবা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নে খরচ সংকুচিত করা, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে খাবারের মানের ওপর। স্বাস্থ্যখাতে পিই-এর আগ্রাসন রুখতে মার্কিন ডেমোক্র্যাটরা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও খাদ্যখাতে এমন কোনো জোরালো প্রতিরোধ এখনও গড়ে ওঠেনি। ইউএস-এর ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশনও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে গ্রিনওয়েল লক্ষ্য করেছেন যে, তরুণ জেন জি প্রজন্ম পিই-মালিকানাধীন চেইনে খাওয়ার ব্যাপারে বেশ সচেতন ও নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে।
নিউ ইয়র্কের মতো তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে রেস্টুরেন্ট চালানো অত্যন্ত কঠিন। অতিরিক্ত ভাড়া, ইনস্যুরেন্স ও শ্রমের খরচের কারণে পিই বা ধনী বন্ধুদের সাহায্য ছাড়া রেস্টুরেন্ট টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানান জয়া সাক্সেনা। নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত পিৎজা জয়েন্ট 'স্কার্স'-এর মালিক স্কার পিমেন্টেল এক অনলাইন সাক্ষাৎকারে বলেন, অনেক রেস্টুরেন্ট আসলে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা পিই-এর ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করে, যা সাধারণ মানুষ বোঝে না। তিনি স্বাধীন রেস্টুরেন্টগুলোকে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় রাজনীতিকদের সহায়তার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, আমেরিকান ইনভেস্টমেন্ট কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী উইল ডানহাম দাবি করেন, পিই দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ও দক্ষতা সরবরাহ করে ছোট ব্যবসাকে বড় হতে সাহায্য করে। তিনি জানান, ৮৫ শতাংশ পিই অর্থায়ন ছোট ব্যবসায় যায়। যেমন ২০২৪ সালে ব্ল্যাকস্টোন 'জার্সি মাইকস' স্যান্ডউইচ চেইনের শেয়ার কিনে নেয় এবং চলতি সপ্তাহে এটি পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত হয়, যা ব্যাপক সফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি এমনকি টানা ১১ বছর ধরে শীর্ষে থাকা 'চিক-ফিল-এ'-কে হটিয়ে কাস্টমার স্যাটিসফ্যাকশন ইনডেক্সে এক নম্বরে উঠে এসেছে।
তবে পিই-এর কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো 'প্যানেরা ব্রেড'। নব্বইয়ের দশকে আরামদায়ক পরিবেশ এবং চমৎকার পাউরুটির জন্য এটি জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু পিই ফার্মের অধিগ্রহণের পর এর নিজস্বতা হারিয়ে যায়। ২০১০ সালে তারা 'পে হোয়াট ইউ ক্যান' নামক একটি দাতব্য উদ্যোগ চালু করলেও তা ব্যর্থ হয় এবং কর্মীরা ফ্রিতে খাবার দেওয়ার বদলে গ্রাহকদের কাজ করতে বাধ্য করত। বর্তমানে প্যানেরা মূলত তাদের অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত 'চার্জড লেমনেড' পানের পর দুইজনের মৃত্যু এবং অনেকের হৃদযন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতির মামলার কারণে নেতিবাচকভাবে পরিচিত।
প্রিয় খাবারের দোকান বা স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী রেস্টুরেন্টগুলো কর্পোরেট রূপ ধারণ করায় গ্রাহকদের ব্যক্তিগত আবেগও আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। মেগান গ্রিনওয়েল নিজেই লস ট্যাকোস নং ১-এর ভক্ত। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, নিউ ইয়র্কে হাতেগোনা কয়েকটি জায়গায় ভালো ট্যাকো পাওয়া যায়, আর তার মধ্যে একটিও এখন কর্পোরেট মালিকানায় চলে গেল।

