স্পেনের টোলেডো প্রদেশের উর্দায় দুটি উচ্চগতির ট্রেনের সংঘর্ষের ঘটনায় প্রাণহানি বেড়ে ৬৯ জনে পৌঁছেছে। বুধবারের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনাস্থলে সারারাত ক্রেন দিয়ে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বগিগুলো সরানোর কাজ চলে। বৃহস্পতিবারও উদ্ধারকর্মীরা দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের ভেতর থেকে কম্বলে মোড়ানো মরদেহ বের করে আনেন। আঞ্চলিক প্রধান এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পেজে জানান, রাতভর উদ্ধার অভিযানের সময় নতুন করে মানবাবশেষ পাওয়া গেছে এবং দুর্ঘটনাস্থলে এখন উল্টে থাকা একটি বগির ওপর ক্রেন দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। তবে ওই বগির নিচে আর কোনো মরদেহ নেই বলে ধারণা করা হলেও তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
স্পেন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ দুর্ঘটনায় সাতটি দেশের অন্তত ৪২ জন বিদেশী নাগরিক জড়িত ছিলেন, যাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন এবং অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে হাসপাতালে এখনো ৫৭ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধারকাজে বিশাল বহর মোতায়েন করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে ৮০০ জনেরও বেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্য, ২০০টিরও বেশি যানবাহন, তিনটি হেলিকপ্টার, একটি মোবাইল কমান্ড পোস্ট, ড্রোন, অশ্বারোহী ইউনিট এবং উদ্ধারকারী কুকুর নিয়োজিত রয়েছে।
তদন্তের অংশ হিসেবে টোলেডোর একজন বিচারক মাদ্রিদ-সেভিল হাই-স্পিড রেললাইনের উভয় দিকে দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এর ফলে জরুরি সেবা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও বিচার বিভাগীয় সদস্য ছাড়া অন্য যে কারও দুর্ঘটনাস্থলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে; আগামী ২৯ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের প্রচার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং বিরোধীদলীয় নেতা আলবার্তো নুনেজ ফিজো। নিহতদের স্মরণে স্পেন সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ টোলেডো সফর করে উদ্ধার ও সমন্বয় সভা তদারকি করেন এবং জানান যে ভুক্তভোগীদের সহায়তা দিতে এবং ট্র্যাজেডির শেষ বিবরণ পর্যন্ত উদঘাটন করতে কর্তৃপক্ষ দিনরাত কাজ করছে। অন্যদিকে পিপলস পার্টির নেতা ফিজো উর্দায় পরিদর্শনের কথা রয়েছে, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা দুর্ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছিলেন।
পরিবহন মন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে কয়েকটি ট্রেন থেমে যাওয়ার পর রাষ্ট্রায়ত্ত রেনফে পরিচালিত একটি ট্রেনকে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু সামনে ইরিও পরিচালিত একটি ট্রেন আগে থেকেই থেমে ছিল। একই লাইনে দুটি ট্রেনের উপস্থিতিতে রেনফের ট্রেনকে কেন এগোনোর অনুমতি দেওয়া হলো, সেটিকে অসংগত ও ব্যাখ্যাতীত বলে মন্তব্য করেছে সরকার। অন্যদিকে রেলওয়ে ইউনিয়নগুলো বাজেট স্বল্পতা ও নিরাপত্তার সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করে বলেছে, গত জানুয়ারিতে একই লাইনে একই কোম্পানির মারাত্মক দুর্ঘটনার পর এপ্রিলে শুরু হওয়া আলোচনাগুলো ভেস্তে গিয়েছিল। ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো দে কম্পোসতেলায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পর এটিই ইউরোপে সবচেয়ে প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা।
ঘটনার পরপরই রেল নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগের দাবিতে পূর্বনির্ধারিত ধর্মঘটে নামে স্পেনের ট্রেন চালকরা। চালকদের ইউনিয়ন সেমাফ-এর নেতা দিয়েগো মার্টিন মাদ্রিদের এতোচা রেল স্টেশনে জানান, খাতটিকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তারা অব্যাহত রাখবেন এবং এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। রেনফে জানিয়েছে, এই ধর্মঘটের কারণে ট্রেন চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে, তবে যাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে টিকিট পরিবর্তন বা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। এদিকে ভ্যাটিকান জানিয়েছে, পোপ লিও নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন, আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন এবং উদ্ধারকর্মীদের তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন।

