
প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের জীবনের বড় একটা অংশ এখন হাতের মুঠোয় ইন্টারনেট নির্ভর। কিন্তু এই সহজ জীবনযাত্রার আড়ালেই ওঁৎ পেতে আছে এক অদৃশ্য বিপদ। অস্ট্রেলিয়াজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ‘আইডেন্টিটি ক্রাইম’ বা ডিজিটাল পরিচয় চুরির ঘটনা। সাধারণ মানুষের একটুখানি অসচেতনতা আর স্ক্যামারদের পাতা চতুর ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন অগণিত মানুষ হারিয়ে ফেলছেন তাদের জমানো অর্থ, এমনকি নিজেদের আসল পরিচয়ও।
১. ‘পরিচয় চুরি’ আসলে কী এবং কীভাবে ঘটে?
কারো সম্মতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর তথ্য যেমন ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, মেডিকেয়ার নম্বর বা ব্যাংকিং তথ্য হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা করার নামই আইডেন্টিটি ক্রাইম। সিডনি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব কম্পিউটার সায়েন্সের সিনিয়র লেকচারার সুরাংগা সেনেভিরাত্নের মতে, স্ক্যামাররা অন্যের তথ্য চুরি করে ক্রেডিট কার্ড নেওয়া, ব্যাংক ঋণ তোলা, ট্যাক্স রিটার্ন হাতানো কিংবা ভুক্তভোগীর ছদ্মবেশ ধরে নানা আর্থিক সুবিধা হাতিয়ে নেয়।
মজার বিষয় হলো, পরিচয় চুরি শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ নয়। সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, হ্যাকিং বা ফিশিং ইমেইলের পাশাপাশি অফলাইনেও চলছে এই চুরি। অপ্রয়োজনীয় ভেবে আমরা যে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা প্রয়োজনীয় কাগজের টুকরো ডাস্টবিনে ফেলে দিই, সেখান থেকেও তথ্য সরায় অপরাধীরা যাকে বলা হয় ‘ডাম্পস্টার ডাইভিং’। অস্ট্রেলিয়ান কম্পিটিশন অ্যান্ড কনজিউমার কমিশন (ACCC)-এর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনার শেয়ার করা সামান্য একটা ছবিও অপরাধীদের শিকার খোঁজার পথ সুগম করে দেয়।
২. ক্ষতির ভয়াবহতা: কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি
পরিসংখ্যান বলছে, এই সাইবার চোরের দল কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ACCC পরিচালিত ‘স্ক্যামওয়াচ’ (Scamwatch)-এর তথ্য অনুযায়ী:
- ২০২১ সালে ক্ষতি: ৩২০ মিলিয়ন ডলার।
- ২০২২ সালে ক্ষতি: ৫৬৮ মিলিয়ন ডলার (যা আগের বছরের চেয়ে ৮০% বেশি)।
তবে এটি তো কেবল রিপোর্টেড তথ্য; বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়ে বহুগুণ বেশি, কারণ অনেকেই লজ্জায় বা না বুঝে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগই করেন না।
৩. কীভাবে বুঝবেন আপনার তথ্য চুরি হয়েছে?
জাতীয় পরিচয় ও সাইবার সহায়তা সংস্থা ‘আইডিকেয়ার’ (IDCARE)-এর প্রতিনিধি সারাহ কাভানাহ জানান, অনেক সময় ভুক্তভোগীরা টেরও পান না যে তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। নিচের লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হওয়া জরুরি:
- প্রত্যাশিত কোনো অফিশিয়াল মেইল বা চিঠিপত্র আসা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
- ব্যাংক বা ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্টে অচেনা লেনদেনের উপস্থিতি।
- যে পণ্য কেনেননি, তার ইনভয়েস, বিল বা নোটিশ আসা।
- কোনো ঋণের আবেদন হঠাৎ প্রত্যাখ্যাত হওয়া।

৪. আত্মরক্ষা ও প্রতিকার: ‘থামুন, ভাবুন এবং রক্ষা করুন’
সব সতর্কতা মেনেও অনেকে বিপদে পড়েন। সিডনি ইউনিভার্সিটির ফাইন্যান্স বিভাগের সিনিয়র লেকচারার অ্যান্ড্রু গ্র্যান্ট নিজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণকালে বায়োমেট্রিক সতর্কতার অভাবে তথ্য চুরির শিকার হয়েছিলেন।
তাই বিশেষজ্ঞরা তিনটি মূল পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন:
- সতর্কতা ও সচেতনতা: অপরিচিত ইমেইল বা মেসেজের লিংকে ক্লিক করবেন না। ফোন অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড শক্তিশালী রাখুন। ডাকবাক্স লক্ রাখুন এবং পুরনো ব্যক্তিগত কাগজ ফেলে দেওয়ার আগে কুচি কুচি করে নষ্ট করুন।
- ক্রেডিট ব্যান (Credit Ban): পরিচয় চুরি হয়েছে সন্দেহ হলে অস্ট্রেলিয়ার তিনটি প্রধান ক্রেডিট রিপোর্টিং সংস্থার মাধ্যমে নিজের ক্রেডিট রিপোর্ট সাময়িকভাবে বন্ধ (Ban) করে দিন। অ্যান্ড্রু গ্র্যান্টের মতে, এতে নতুন করে কেউ আপনার নামে ঋণ বা ক্রেডিট কার্ড নিতে পারবে না।
- অভিযোগ ও সহায়তা: সন্দেহজনক কিছু ঘটলে অবিলম্বে ‘IDCARE’-এ যোগাযোগ করুন এবং ‘Scamwatch’-এর ওয়েবসাইটে অভিযোগ রিপোর্ট করুন।
বিশেষজ্ঞদের মূল বার্তা:
যেকোনো আর্থিক লেনদেন বা ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদানের আগে ‘থামুন, ভাবুন এবং নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন’। স্ক্যামাররা প্রতিদিন নিত্যনতুন ও জটিল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে; তাই আমাদের সামান্য সচেতনতাই হতে পারে তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
