ক্যারিবিয়ান এবং মেক্সিকো উপসাগরের উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল পরিমাণ সারগাসাম শৈবাল। এই শৈবালের আস্তরণ উপকূলীয় এলাকাগুলোকে ঢেকে ফেলেছে, যা শুধু সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যকেই ধ্বংস করছে না, বরং পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল অঞ্চলগুলোতে পর্যটকদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপটিক্যাল ওশানোগ্রাফি ল্যাবের শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে আটলান্টিক, ক্যারিবিয়ান এবং মেক্সিকো উপসাগরে প্রায় ২৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন সারগাসাম শৈবাল রেকর্ড করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এবারই প্রথম এই বিশাল পরিমাণ শৈবাল শুধু সমুদ্রের স্রোতে ভেসে আসেনি, বরং ক্যারিবিয়ান ও মেক্সিকো উপসাগরের স্থানীয় অঞ্চলেই প্রচুর পরিমাণে জন্মেছে। সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্টিস্ট ও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ব্রায়ান বার্নস জানান, এটি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয় এবং প্রতি বছরই নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে 'গ্রেট আটলান্টিক সারগাসাম বেল্ট' ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে কৃষি বর্জ্য, উষ্ণ পানি এবং বাতাস, সমুদ্রস্রোত ও বৃষ্টির পরিবর্তনকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছর জুন মাসে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সারগাসামের পরিমাণ রেকর্ড স্পর্শ করেছে এবং মেক্সিকো উপসাগরে এর পরিমাণ ছিল ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, ২০২৬ সালে আটলান্টিক ও সংলগ্ন এলাকায় শৈবালের পরিমাণ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। জুন মাসেই সেখানে ৩৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন শৈবাল দেখা গেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ কম।
এই শৈবাল উপকূলের কাছাকাছি এলে পচে গিয়ে পচা ডিমের মতো দুর্গন্ধ ছড়ায়, যা অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন করে। মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (EPA) সতর্ক করেছে যে, এই গ্যাসের প্রভাবে মানুষের বমি ভাব, মাথাব্যথা এবং ফুসফুসে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা হতে পারে। মার্টিনিক দ্বীপের বাসিন্দারা বিষাক্ত গ্যাসের কারণে প্রতিবাদ জানালে কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে আশ্রয়কেন্দ্র খুলতে বাধ্য হয়। মার্টিনিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ বছর তারা ১১,৫০০ টনেরও বেশি শৈবাল সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে চলতি মাসের চার দিনেই ৬৩৮ টন সংগ্রহ করা হয়েছে।
মেক্সিকো সরকার এই পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। মেক্সিকোর কুইন্টানা রু রাজ্যের পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বছরের প্রথমার্ধে তাদের বিক্রি ৩০ শতাংশ কমেছে। এর আগে পুয়ের্তো রিকোর উপকূলীয় এলাকায় শৈবালের আধিক্যের কারণে গভর্নর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
শৈবাল যখন সাগরের মাঝখানে থাকে, তখন তা কচ্ছপ, মাছ ও সামুদ্রিক পাখিদের জন্য একটি আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু উপকূলে পৌঁছানোর পর এটি পানির অক্সিজেন কমিয়ে দেয়, ম্যানগ্রোভের শিকড় শ্বাসরোধ করে এবং প্রবাল ও সামুদ্রিক ঘাসের ওপর সূর্যের আলো পৌঁছাতে বাধা দেয়। এছাড়া, সৈকত থেকে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে শৈবাল অপসারণের সময় কচ্ছপের ডিম ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসে শৈবালের স্তূপ এতটাই বেশি যে, সেখানে পর্যটকদের পানি পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় ২৫ ফুট পথ শৈবালের ওপর দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে।
সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউএস ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের গবেষকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে দেখেছেন যে, ২০০৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আটলান্টিক ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে শৈবালের বিস্তার প্রতি বছর ১৩ শতাংশেরও বেশি হারে বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে এই ব্লুম ১৬.৯ মিলিয়ন বর্গ মাইল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

