মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদীকে তীব্র পানিসঙ্কট থেকে রক্ষা করতে একটি ১০ বছরের খসড়া পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে দেশটির ফেডারেল সরকার। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান খরার মুখে এই পরিকল্পনাকে যথেষ্ট মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। মার্কিন ব্যুরো অব রিক্লেমেশন এই প্রস্তাবনা প্রকাশ করেছে, যা ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা এবং নেভাদার মতো নিম্ন অববাহিকার অঙ্গরাজ্যগুলোতে পানির সরবরাহ সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
নতুন এই ফেডারেল রূপরেখা অনুযায়ী, তিন রাজ্য সম্মিলিতভাবে বছরে ৩০ লাখ একর-ফুট পর্যন্ত পানি হারাতে পারে। এক একর-ফুট পানি বলতে বোঝায় একটি ফুটবল মাঠকে এক ফুট গভীর পানিতে ঢেকে দেওয়ার সমপরিমাণ পানি, যা প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার গ্যালন বা ১২ লাখ লিটারের সমান। এই পরিমাণ পানি দিয়ে সাধারণত তিনটি পরিবার এক বছর চলতে পারে। পূর্ববর্তী চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালের অক্টোবরে শেষ হতে চলায় এই নতুন খসড়াটি তৈরি করা হয়েছে, যা আগামী ১০ বছর প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর পর্যালোচনার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
তবে পানি বিশেষজ্ঞরা এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না বলে একটি সাময়িক পদক্ষেপ বা 'স্টপগ্যাপ' হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো নদীর মূল অবকাঠামো রক্ষা করা এবং অববাহিকার সাতটি অঙ্গরাজ্যকে নিজেদের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আরও কিছু সময় দেওয়া। কলোরাডো নদীর পানি বণ্টন নিয়ে গত তিন বছর ধরে উচ্চ অববাহিকার রাজ্যগুলো (কলোরাডো, নিউ মেক্সিকো, ইউটা ও ওয়াইওমিং) এবং নিম্ন অববাহিকার রাজ্যগুলোর (ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা ও নেভাদা) মধ্যে তীব্র বিরোধ চলছে এবং তারা একের পর এক সময়সীমা পার করলেও কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।
কলোরাডো নদী উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম জলপথ, যা রকি পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে মেক্সিকো পর্যন্ত ১,৪৫০ মাইল (২,৩০০ কিলোমিটার) পথ অতিক্রম করেছে। এই নদীটি প্রায় ৪ কোটি মানুষ, বহু আদিবাসী গোষ্ঠী এবং দুটি দেশের পানির চাহিদা মেটায়। পাশাপাশি এটি প্রায় ৫৫ লাখ একর (২.২৩ লাখ হেক্টর) কৃষিজমিতে সেচ দেয় এবং লস অ্যাঞ্জেলেস, ফিনিক্স ও লাস ভেগাসের মতো বড় শহরগুলোর জীবন সচল রাখে। এই নদীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। নদীর প্রধান দুটি জলাধার—লেক মিড এবং লেক পাওয়েলের বিশাল বাঁধগুলো লাখ লাখ মানুষের জলবিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এছাড়া এই অববাহিকায় ১৫০টিরও বেশি বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ বাস করে।
ইউসিএলএ (UCLA)-এর পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের পানি গবেষক নোয়াহ গ্যারিসন এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "এটি কেবল সমস্যাটিকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া। আমরা যদি এখনই এর সমাধান না করি, তবে অত্যন্ত মারাত্মক পরিণতি হতে পারে। আমরা ৪ কোটি মানুষের পানি সরবরাহকে ঝুঁকিতে ফেলছি।" কলোরাডো নদীর ভারসাম্য বজায় রাখতে বার্ষিক গড় প্রবাহের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি অর্থাৎ ৩০ লাখ একর-ফুটের বেশি পানি কাটা প্রয়োজন। কিন্তু শুষ্ক বছরগুলোতে এই কাটছাঁটও যথেষ্ট নাও হতে পারে। সম্প্রতি লেক পাওয়েল এবং লেক মিডের পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে গেছে। ওয়েস্টার্ন রিসোর্স অ্যাডভোকেটসের আঞ্চলিক নীতি ব্যবস্থাপক ড. জন বারগ্রেন বলেন, "সিস্টেমটিকে সর্বোত্তমভাবে রক্ষা করতে হলে বেশ বড় ধরনের ঘাটতি মেনে নিতে হবে। আমাদের আরও অনেক কিছু করতে হবে।"
১৯২২ সালের একটি চুক্তি অনুযায়ী উচ্চ ও নিম্ন অববাহিকার রাজ্যগুলোর মধ্যে সমানভাবে (প্রতিটিতে ৭৫ লাখ একর-ফুট) পানি বণ্টন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে কলোরাডো নদীর গড় প্রবাহ বছরে মাত্র ১ কোটি একর-ফুটে নেমে এসেছে, যা পূর্বের শতকের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ কম। এর ফলে চাহিদার তুলনায় পানির প্রাপ্যতার মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। কলোরাডো নদীর পানির ৭০ শতাংশেরও বেশি ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে, বিশেষ করে গবাদি পশুর খাদ্য আলফালফা ও খড় এবং শীতকালীন শাকসবজি চাষে। এ বছর তীব্র শীতকালীন খরা এবং বসন্তের তীব্র দাবদাহের কারণে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। গ্রীষ্মের শুরুতে লেক পাওয়েলের পানির স্তর গ্লেন ক্যানিয়ন বাঁধের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার সীমা থেকে মাত্র ৩৭ ফুট উপরে ছিল।
উটা স্টেট ইউনিভার্সিটির কলোরাডো রিভার স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক ড. জ্যাক শ্মিট সতর্ক করে বলেন, "যদি আমাদের আরেকটি মাঝারি ধরনের তুষার গলনের বছর যায়, তবে আমরা খাদের কিনারায় চলে যাব। এমনকি যদি আমরা একটি সেরা বছরও পাই, তবুও এই সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাব না।" কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ পানি ও জলবায়ু গবেষক ব্র্যাড উডাল বলেন, এল নিনো (El Niño) জলবায়ু পরিস্থিতি হয়তো এ শীতে কিছু বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে, তবে তা এই সংকট থেকে আমাদের বাঁচাতে পারবে না। এটি কেবল আমাদের কিছুটা সময় দেবে।
ফেডারেল সরকারের রাজ্যগুলোর পানি নীতির ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপের সীমিত ক্ষমতা থাকলেও তারা লেক পাওয়েল এবং লেক মিড নিয়ন্ত্রণ করে। এই নতুন পরিকল্পনায় কলোরাডো, ইউটা, ওয়াইওমিং এবং নিউ মেক্সিকোকে পানি সংরক্ষণের জন্য উৎসাহিত করতে সঞ্চিত পানির ওপর ক্রেডিট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা প্রায় ২ লাখ একর-ফুট পানি সাশ্রয় করতে পারে। তবে নিম্ন অববাহিকার রাজ্যগুলো এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করছে। ক্যালিফোর্নিয়ার কলোরাডো রিভার বোর্ডের চেয়ারম্যান জেবি হ্যাম্বি বলেন, "এটি একটি সেতু, কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মাত্র তিনটি রাজ্য পুরো সাতটি রাজ্যের দায়িত্ব বহন করতে পারে না।" অ্যারিজোনার গভর্নর কেটি হবস এবং নেভাদার গভর্নর জো লম্বার্ডো এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। উটা কলোরাডো রিভার অথরিটির নির্বাহী পরিচালক অ্যামি হাস সতর্ক করেছেন যে, রাজ্যগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা কয়েক দশক ধরে আইনি লড়াইয়ে রূপ নিতে পারে। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির পানির আইনের অধ্যাপক রেট লারসন জানান, এই সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যেই নিম্ন অববাহিকার রাজ্যগুলো উচ্চ অববাহিকার বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের মামলা করতে পারে, যা সরাসরি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে গড়াবে।

