বসনিয়া যুদ্ধে ভয়াবহ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বসনীয় সার্ব সামরিক কমান্ডার রাতকো ম্লাদিচ হেগের একটি জাতিসংঘ কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মৃত্যুকালে "বসনিয়ার কসাই" নামে পরিচিত এই যুদ্ধাপরাধীর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
১৯৯২-৯৫ সালের সাবেক যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধের সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের জন্য ২০১৭ সালে ম্লাদিচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২১ সালে জাতিসংঘের আপিল আদালত তার এই সাজা বহাল রাখেন। বসনিয়া যুদ্ধের পর দীর্ঘ ১৬ বছর আত্মগোপনে থাকার পর ২০১১ সালে সার্বিয়ার একটি গ্রামীণ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরের আন্তর্জাতিক আদালতে তার বিচার শুরু হয়। ২০১১ সাল থেকেই তিনি হেগের এই জাতিসংঘ আটক কেন্দ্রে বন্দি ছিলেন, যদিও তিনি কখনোই এই আদালতের বৈধতা স্বীকার করেননি।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের আদালত ম্লাদিচের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। আদালত জানিয়েছে, তিনি জাতিসংঘ আটক কেন্দ্রের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পর ডাচ কর্তৃপক্ষ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের আদালতের প্রধান বিচারপতি ম্লাদিচের মৃত্যুর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
চলতি বছরের মে মাসে ম্লাদিচের আইনজীবীরা তার আশঙ্কাজনক শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে কারাগার থেকে মুক্তির আবেদন জানিয়েছিলেন, যা আদালত খারিজ করে দেয়। সে সময় বিচারক স্বীকার করেছিলেন যে ম্লাদিচের পরিস্থিতি "অত্যন্ত নাজুক", তবে তিনি কারাগারে "ব্যাপক এবং সহানুভূতিশীল চিকিৎসা" পাচ্ছেন বলে রুলিং দেওয়া হয়। আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন, ম্লাদিচ দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী বা হুইলচেয়ারে বন্দি ছিলেন এবং পরবর্তীতে স্ট্রোকের শিকার হয়ে কথা বলার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলেন।
১৯৯০-এর দশকে বসনীয় ক্রোয়াট এবং বসনিয়াক (বসনীয় মুসলিম) বাহিনীর বিরুদ্ধে বসনীয় সার্ব বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ম্লাদিচ। তার বাহিনীর বিরুদ্ধে অ-সার্ব জনগণকে জোরপূর্বক বিতাড়িত করার লক্ষ্যে "জাতিগত নিধনযজ্ঞ" চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তার নির্দেশেই সারায়েভো শহর অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, যেখানে ১০,০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া স্রেব্রেনিৎসায় প্রায় ৮,০০০ পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে পরিচিত।
ম্লাদিচের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার শিকার এবং ওই ঘটনায় নিজের যমজ ভাই ও বাবাকে হারানো হাসান হাসানোভিচ বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে বলেন, ম্লাদিচের মৃত্যু তাদের ক্ষত উপশম করবে না, কারণ স্রেব্রেনিৎসায় যাদের হত্যা করা হয়েছে তারা আর কখনো ফিরে আসবে না। বর্তমানে স্রেব্রেনিৎসা মেমোরিয়াল সেন্টারে কর্মরত হাসানোভিচ বলেন, "তার মৃত্যু কেবল একটি জৈবিক অনিবার্যতা মাত্র। এটি সেই রাজনৈতিক ও সামরিক প্রকল্পের অবসান ঘটায় না যা গণহত্যার এই উত্তরাধিকার তৈরি করেছে। আমরা এখন একটি বিভক্ত দেশ এবং গণহত্যা অস্বীকারের পরিণতি নিয়ে বেঁচে আছি।"
can অন্যদিকে, বসনীয় সার্ব বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মিলোরাদ দোদিক রয়টার্সকে বলেন, ম্লাদিচ "সার্ব জনগণের কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন। একজন কমান্ডার হিসেবে তিনি সার্বদের রক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন।" সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের কিছু বাসিন্দাও তার প্রশংসা করেছেন। মিলান নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেন, "আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি তিনি সার্বিয়ান জনগণকে রক্ষা করেছিলেন, কারণ সর্বোপরি এটিই ছিল তার দায়িত্ব।" ভাসিলিয়ে নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, "এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক ও চরম অন্যায় যে তাকে হেগের আদালতে পাঠানো হয়েছিল।"

