ইউরেশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী নেতাদের উপস্থিতিতে আগামী সপ্তাহে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শীর্ষ সম্মেলন। আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব, দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের পটভূমিতেই আগামী ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপ্রধানদের এই শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
এবারের সম্মেলনে বিশেষভাবে নজর থাকবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে হিমালয় সীমান্ত নিয়ে বিরোধের পর সম্প্রতি চীন ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা বরফ গলার ইঙ্গিত মিলেছে। গত ২৫ আগস্ট বেইজিংয়ে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। বিশকেকের এই সম্মেলন তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাতের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। কাশ্মীর সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এই সম্মেলনে যোগ দেবেন। সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করার কথা রয়েছে, কারণ তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশ ও সংস্থাগুলোর ওপর দ্বিতীয় দফায় নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে 'সাংহাই ফাইভ' হিসেবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সামরিক উত্তেজনা ও সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান মিলে এটি গঠন করেছিল। ২০০১ সালে উজবেকিস্তান যোগ দেওয়ার পর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে এসসিও হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান, ২০২৩ সালে ইরান এবং ২০২৪ সালে বেলারুশ এর পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে। বর্তমানে এই সংস্থার সদস্য সংখ্যা ১০টি। এছাড়া আফগানিস্তান ও মঙ্গোলিয়া পর্যবেক্ষক হিসেবে এবং তুরস্ক, আজারবাইজান ও সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশ সংলাপ সহযোগী হিসেবে রয়েছে।
এসসিও কোনো সামরিক জোট বা অর্থনৈতিক ইউনিয়ন নয়, বরং নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম। এটি বিশ্বের প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ।
এবারের সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও আফগানিস্তান পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হবে। সন্ত্রাসবাদ দমন এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধিও থাকবে মূল আলোচনায়। সদস্য দেশগুলো একটি এসসিও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গঠন এবং ইউরেশিয়াজুড়ে পরিবহন ও মালবাহী যোগাযোগ উন্নত করার প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর (আইএনএসটিসি) অন্যতম, যা ইরানের মধ্য দিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গ ও মুম্বাইকে যুক্ত করবে।
সম্মেলন শেষে সংস্থার ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে 'বিশকেক ঘোষণা' এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কিছু নথি গৃহীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে কিরগিজস্তানের সভাপতিত্বের মেয়াদ শেষ হবে এবং পরবর্তী এক বছরের জন্য এসসিও-র নেতৃত্ব পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পাকিস্তান ২০২৭ সালের শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করবে।

