ইতালির কুখ্যাত মাফিয়া চক্রের হাতে মায়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর নিজের বাবার বিরুদ্ধে আদালতে সাহসী সাক্ষ্য দেওয়া ডেনিস কসকো মারা গেছেন। রোমের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩৫ বয়সীবী এই তরুণীর মৃত্যু হয়। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি নিজের জীবন নিজেই কেড়ে নিয়েছেন। গত রবিবার তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল।
ডেনিসের মা লেয়া গারোফালো ২০০৯ সালে খুন হন। ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় শক্তিশালী অপরাধী চক্র ‘এনদ্রাঙ্গেতা’র (Ndrangheta) বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হয়ে মাফিয়া বিরোধী আন্দোলনের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ডেনিস যখন তার বাবার বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তার সাহসিকতার প্রশংসা করেছিল পুরো দেশ। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে তাকে চরম মানসিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে, মা যখন খুন হন তখন তার বয়সও ছিল ৩৫ বছর।
ডেনিসের মৃত্যুর খবরটিকে পুরো দেশের জন্য এক "গভীর ক্ষত" হিসেবে বর্ণনা করেছেন মাফিয়া বিরোধী আইনজীবী ও সিনেটর এনজা রান্দো, যিনি ডেনিসের পক্ষে আইনি লড়াই লড়েছিলেন। তিনি বলেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে মাফিয়ারা শুধু মানুষকে হত্যাই করে না, বরং বেঁচে থাকাদের জীবন ও আত্মায় "প্রকৃত দানব" তৈরি করে।
মাফিয়া বিরোধী সংগঠন ‘লিভেরা’র কো-প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সেসকা রিসপোলি বলেন, এই মৃত্যু অপরাধ জগতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ লড়াইকে সামনে এনেছে। বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, "মাফিয়া কেবল বাহ্যিক কোনো বিষয় নয়। আপনি চাইলেই এটি ছেড়ে যেতে পারেন, নিজের নাম বদলে ফেলতে পারেন। কিন্তু পারিবারিক বন্ধনটি মনের গভীরে থেকে যায়, যা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব।"
মায়ের মতো ডেনিসও বহু বছর ধরে নতুন নাম ও পরিচয় নিয়ে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় বাস করছিলেন। তবে রিসপোলি জানান, ডেনিস অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থার মধ্যে ছিলেন এবং জীবনের এক চরম শূন্যতা পূরণের জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কারাগারে থাকা বাবা কার্লো কসকোর সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ শুরু করেছিলেন। বন্ধুদের মতে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং আসক্তির সঙ্গে লড়াই করছিলেন।
রিসপোলি যুক্তি দেন, যারা মাফিয়া পরিবার ছেড়ে নতুন জীবন গড়তে চান, তাদের হয়তো এক বছরের জন্য নয়, বরং সারাজীবন সহায়তার প্রয়োজন। কারণ ইতালির অপরাধী চক্রগুলো, বিশেষ করে এনদ্রাঙ্গেতা, অত্যন্ত নিবিড় পারিবারিক নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ডেনিসের ক্ষেত্রে তার বাবা ও মা উভয়ের পরিবারই মাফিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ডেনিস কখনোই তার বাবার এই মিথ্যা গল্প বিশ্বাস করেননি যে তার মা তাকে ফেলে অস্ট্রেলিয়ায় নতুন জীবন শুরু করতে চলে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে, কার্লো কসকো কৌশলে লেয়া গারোফালোকে এক বৈঠকে ডেকে এনে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর তার মরদেহ টুকরো টুকরো করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। কয়েক বছর পর, অন্যতম এক হত্যাকারীর স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পুলিশ লেয়ার হাড়ের কিছু অংশ ও একটি নেকলেস উদ্ধার করতে সক্ষম হয়, যা দেখে ডেনিস তার মায়ের দেহাবশেষ শনাক্ত করেছিলেন। ২০১৩ সালে মায়ের রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে ডেনিস সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তার মায়ের অসীম সাহসের কথা স্মরণ করেছিলেন।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ডেনিস নিজেকে "ন্যায়বিচারের এক গর্বিত সাক্ষী" হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। আড়ালে থেকে দেওয়া সেই জবানবন্দিতে তিনি বলেছিলেন, নিজের জীবন নতুন করে শুরু করার জন্য "ভেতরের স্বাধীনতা" পেতেই তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ডেনিসের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তার বাবা ও তিন সহযোগীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা বর্তমানে তারা কারাগারে ভোগ করছেন।
ডেনিসের মৃত্যুকে ঘিরে কেউ তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে ইতালির প্রসিকিউটররা। ইতিমধ্যে তার ফোনটি জব্দ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এদিকে, শুক্রবার সন্ধ্যায় মিলানের যে স্থান থেকে ডেনিসের মাকে অপহরণ করা হয়েছিল, তার কাছে শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধুরা জড়ো হয়ে ডেনিসকে স্মরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। লিভেরার প্রেসিডেন্ট লুইজি সিওত্তি ডেনিসের জীবনকে স্মরণ করে লিখেছেন, "ডেনিসের পুরো জীবনটাই কেটেছে সাহস ও যন্ত্রণার দুই চরম সীমানার মাঝে। আজ সেই নাজুক ভারসাম্য চিরতরে ভেঙে গেল।"

