স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে উগ্র-ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলের বড় জয়ের পর দেশটির পার্লামেন্টে (বুন্দেসট্যাগ) চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ ও এএফডি নেত্রী অ্যালিস উইডেলের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হয়েছে। এএফডি-র নির্বাচনী বিজয়ের পর এটিই ছিল দুই নেতার প্রথম মুখোমুখি বিতর্ক। চ্যান্সেলর মার্জ এএফডি-কে একটি "ধ্বংসাত্মক শক্তি" হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, তাদের অভিবাসন নীতি দক্ষ কর্মীদের ক্ষেত্রে এক ধরনের "জাতিগত নিধনের" শামিল।
পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী এএফডি দল প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে বিশাল জয় অর্জন করেছে। অন্যদিকে চ্যান্সেলরের রক্ষণশীল জোটের ভোট কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। এই ফলাফলের প্রেক্ষাপটে পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে উইডেল চ্যান্সেলর মার্জকে লক্ষ্য করে বলেন, ভোটাররা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে মধ্য-বামপন্থীদের সাথে মার্জের জোট সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং তার সময় শেষ হয়ে এসেছে। জবাবে মার্জ বলেন, রাশিয়াকে সমর্থন করে এএফডি জার্মানির স্বার্থের ক্ষতি করেছে এবং তাদের প্রস্তাবিত "রি-মাইগ্রেশন" বা পুনঃঅভিবাসন নীতি লাখ লাখ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র তিনটি আসন দূরে রয়েছে। সেখানে তারা সরকার গঠন করতে পারবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ১৬টি রাজ্যের কোনোটিতেই কোনো উগ্র-ডানপন্থী দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি। চ্যান্সেলর মার্জ স্বীকার করেছেন যে, এই "ভূমিকম্পতুল্য" নির্বাচনী ফলাফল জার্মানির রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এএফডি-র এই সাফল্যের প্রশংসা করে একে পপুলিস্ট বা জনতাবাদী দলের একটি "দারুণ রাত" বলে অভিহিত করেছেন এবং এর জন্য জার্মানির "ভয়াবহ অভিবাসন নীতিকে" দায়ী করেছেন।
পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় এএফডি এমপিদের ক্রমাগত হট্টগোলের মুখে চ্যান্সেলর মার্জ বলেন, জার্মানির প্রতি ছয়জন দক্ষ কর্মীর মধ্যে একজনের অভিবাসন পটভূমি রয়েছে। এএফডি-র নীতি কার্যকর হলে তা গায়ের রঙ ও উৎপত্তির ভিত্তিতে দক্ষ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে জাতিগত নিধন ছাড়া আর কিছুই হবে না। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সরকার অনিয়মিত অভিবাসীদের বিতাড়নের প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও, যারা জার্মানির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন এবং যাদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নেই—এই দুইয়ের মধ্যে সতর্কতার সাথে পার্থক্য বজায় রাখে।
এক পর্যায়ে এএফডি এমপিদের হইচই এতটাই বেড়ে যায় যে বুন্দেসট্যাগ প্রেসিডেন্ট জুলিয়া ক্লকনার পার্লামেন্ট থেকে সদস্যদের বহিষ্কারের হুমকি দিয়ে বলেন, "আমরা কোনো ফুটবল মাঠে বসে নেই।" বিতর্কে উইডেল দাবি করেন যে, গণ-অভিবাসনের কারণে জার্মানিতে প্রতিদিন ছুরি হামলা এবং ট্রেন ও স্টেশনে সহিংসতা ঘটছে। এর জবাবে মার্জ সতর্ক করে বলেন, এএফডি-র পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে দেশের কোনো কেয়ার হোম, হাসপাতাল বা রেস্তোরাঁ সচল রাখা সম্ভব হবে না।
স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে মাত্র ১৭.২ শতাংশ ভোট পাওয়ায় মার্জের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটস দল "ধূলিসাৎ" হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন বিরোধী দলীয় নেত্রী উইডেল। তিনি মার্জের সরকারকে জার্মানিকে দেউলিয়া করার পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেন। মার্জ অবশ্য পাল্টা জবাবে বলেন, এএফডি স্যাক্সনি-আনহাল্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি এবং পুরো জার্মানিতেও কখনও তা পাবে না। তিনি দলটির বিরুদ্ধে ভোটারদের সাথে প্রতারণার অভিযোগ এনে বলেন, নির্বাচনের আগে তারা বলেছিল তাদের মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী উলরিখ সিগমুন্ড কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই শাসন করবেন, কিন্তু ভোটের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা জোটের সঙ্গী খুঁজতে শুরু করেছে।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের উগ্র-ডানপন্থী এএফডি-কে জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ইতিমধ্যে "ডানপন্থী চরমপন্থী" হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দলটি এখন বামপন্থী পপুলিস্ট বিএসডব্লিউ-সহ অন্যান্য দলের সাথে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছে, যদি তারা সিগমুন্ডকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন করে। এমনকি সিগমুন্ডের সহযোগী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মার্জের সিডিইউ যদি উগ্র-ডানপন্থীদের সাথে কাজ না করার তথাকথিত "ফায়ারওয়াল" বা সুরক্ষা প্রাচীর নীতি ত্যাগ করে, তবে তারা একসাথে কাজ করতে পারে। এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই, আমেরিকার ৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার ট্রাম্প ও মার্জের মধ্যে একটি নির্ধারিত ফোনালাপ কোনো কারণ ছাড়াই স্থগিত করা হয়েছে এবং নতুন কোনো তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।

