২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যখন একটি ছিনতাইকৃত বিমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগনে আছড়ে পড়ে, তখন সেখানে নিজের ডেস্কে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাবেক মার্কিন সেনা কর্নেল ম্যাথিউ ক্লিমো। দীর্ঘ সামরিক কর্মজীবনের সেই সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়াবহ দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন, সারা দিন তিনি একজন আদর্শ সৈনিকের মতো শান্ত, অবিচল ও আবেগহীন থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রাতে যখন আর্লিংটন ও ভার্জিনিয়ার নিজের বাড়িতে পৌঁছান, তখন এক তীব্র আবেগ তাকে গ্রাস করে। সেটি ছিল একদিকে যেমন প্রাণহানির বেদনা, অন্যদিকে এক চরম অপমানের গ্লানি।
ম্যাথিউ ক্লিমো তার সদ্য প্রকাশিত ‘অ্যাজ দ্য পেন্টাগন বার্নড’ বইয়ে সেই দিনের বিশৃঙ্খলা, নেতৃত্বের টানাপোড়েন এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নানা ত্রুটি তুলে ধরেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এই সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে পেন্টাগনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই প্রেক্ষাপটে ক্লিমোর এই স্মৃতিকথা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার বইয়ে উঠে এসেছে কীভাবে চরম সংকটের মুহূর্তেও সামরিক কর্মকর্তারা আবেগ চেপে রেখে শান্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করেছিলেন, আবার একই সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে ভুল গোয়েন্দা তথ্য, কমান্ড ব্যবস্থার ওভারল্যাপিং এবং যোগাযোগের বড় ধরনের ঘাটতি।
নিউ ইয়র্কের জনসন সিটিতে জন্ম নেওয়া ক্লিমোর সামরিক ও কূটনৈতিক ক্যারিয়ার প্রায় অর্ধশতাব্দীর। ১৯৭০ সালে ওয়েস্ট পয়েন্টের মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দিয়ে ১৯৭৪ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর ২৯ বছরের দীর্ঘ সেনা জীবনে ১৮তম এয়ারবর্ন কর্পসের প্যারাট্রুপারদের নেতৃত্ব দেওয়া থেকে শুরু করে উপসাগরীয় যুদ্ধে বীরত্বের জন্য ‘সিলভার স্টার’ পদক লাভ করেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে তিনি ছিলেন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের ভাইস-চেয়ারম্যান জেনারেল রিচার্ড মেয়ার্সের নির্বাহী সহকারী। চেয়ারম্যান জেনারেল হিউ শেলটন তখন হাঙ্গেরি সফরে থাকায় মেয়ার্সই ছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান।
সেদিন ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে ক্লিমো অফিসে পৌঁছান। মেয়ার্সের একটি সিনেট শুনানি থাকায় সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে তিনি তার তরুণ এইড-ডি-ক্যাম্প ক্যাপ্টেন ক্রিস ডোনাহুকে নিয়ে ক্যাপিটল হিলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ক্লিমো পেন্টাগনের ডেস্কে থেকে যান এবং হঠাৎ টিভিতে দেখতে পান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আগুন জ্বলছে। প্রথমে তিনি এটিকে কোনো দুর্ঘটনা মনে করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার লাল সুইচের বিশেষ সুরক্ষিত ফোনটি বেজে ওঠে। লাইনে ছিলেন নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডের (নোরাড) কমান্ডার জেনারেল রালফ এবারহার্ট। তিনি অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে মেয়ার্সকে খুঁজছিলেন। ক্লিমো দ্রুত ডোনাহুকে ফোন করে মেয়ার্সকে সিনেটরের অফিস থেকে বের করে আনতে বলেন। এর পরপরই এবারহার্ট আবার ফোন করে জানান, রাডারে বেশ কয়েকটি বিমান দেখা যাচ্ছে এবং তার মধ্যে কতগুলো ছিনতাই হয়েছে তা নিশ্চিত নয়।
একই সময়ে জেনারেল হিউ শেলটন একটি অসুরক্ষিত লাইনে ফোন করেন। ক্লিমো তখন এক কানে সুরক্ষিত লাল সুইচ এবং অন্য কানে শেলটনের ফোন ধরে দুই পক্ষের তথ্য আদান-প্রদান করছিলেন। ঠিক তখনই পুরো ভবনটি কেঁপে ওঠে। তার সেক্রেটারি মেরি টার্নার চিৎকার করে ওঠেন যে ভবনটি নড়ে উঠেছে। বাইরে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। ক্লিমো প্রথমে বুঝতে পারেননি যে ঠিক কী ঘটেছে। পরে ন্যাশনাল মিলিটারি কমান্ড সেন্টারের (এনএমসিসি) একজন কর্মকর্তা লাল সুইচে জানান যে পেন্টাগনে বিমান হামলা হয়েছে। ছিনতাইকৃত ফ্লাইট ৭৭ পেন্টাগনের পশ্চিম পাশে আঘাত হেনেছিল, যার ফলে বিমানের ৬৪ জন আরোহী এবং ভবনের ভেতরে থাকা ১২৫ জন নিহত হন। ভবনটির ওই অংশটি নতুন সংস্কার করায় এবং বুলেটপ্রুফ গ্লাস থাকায় হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কম হলেও, বিস্ফোরণের আগুন করিডোরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ক্লিমো দ্রুত নদীর প্রবেশদ্বারে গিয়ে জেনারেল মেয়ার্সের সঙ্গে দেখা করেন এবং তারা দুজনে জ্বলন্ত ভবনের ভেতর দিয়ে এনএমসিসির ভূগর্ভস্থ কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে তারা চরম বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। নোরাড এবং এয়ার ন্যাশনাল গার্ডের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। নোরাড ল্যাংলি বিমানঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান ওড়ালেও বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার স্পষ্ট নির্দেশিকা (আরওই) তাদের কাছে ছিল না। অন্যদিকে, সিক্রেট সার্ভিস সামরিক চেইনের বাইরে গিয়ে অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে, যাদের ওপর তুলনামূলক শিথিল নিয়ম প্রযোজ্য ছিল। ল্যাংলির পাইলটরা ভুল ফ্লাইট প্ল্যানের কারণে প্রথমে পূর্ব দিকে উড়ে যান, যা তাদের ওয়াশিংটনে পৌঁছাতে দেরি করিয়ে দেয়।
এরই মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডকে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। হামলার পরপরই রামসফেল্ড উদ্ধারকাজে সাহায্য করতে এবং স্ট্রেচার বহন করতে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন। ক্লিমো এটিকে ব্যক্তিগত বীরত্ব হিসেবে দেখলেও সংকটের সময়ে এটি একটি বড় পরিচালনাগত সমস্যা তৈরি করেছিল বলে মনে করেন। রামসফেল্ড যখন এনএমসিসিতে ফিরে আসেন, তখন তিনি এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি যুদ্ধবিমানের ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম নিয়ে কথা বলছিলেন, যা তাদের মধ্যে আরও বিভ্রান্তি তৈরি করে।
ক্লিমোর স্ত্রী ইডি (যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা নার্স) এবং তাদের সন্তান ড্যানিয়েল সেদিন চরম উদ্বেগের মধ্যে কাটিয়েছিলেন। মধ্যরাতের পর যখন ক্লিমো পেন্টাগনের ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হন, তখন তার সারা শরীর ছাইয়ে ঢাকা ছিল এবং গায়ে জেট ফুয়েলের গন্ধ লেগে ছিল। বাড়ি ফেরার পথে ওয়াশিংটনের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমানের টহল দেওয়ার শব্দ শুনে তার মনে হয়েছিল, নিজের দেশের আকাশ সুরক্ষায় এভাবে যুদ্ধবিমান ওড়াতে হওয়াটা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
পরবর্তী সময়ে ক্লিমো তুর্কমেনিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকে তিনি আফগানিস্তান যুদ্ধের সমাপ্তি এবং ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখেন। সেই প্রত্যাহারের শেষ মুহূর্তে কাবুল বিমানবন্দর থেকে শেষ মার্কিন সেনা হিসেবে যে ছবিটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল, সেটি ছিল মেজর জেনারেল ক্রিস ডোনাহুর—যিনি ৯/১১-এর সেই সকালে ক্লিমোর আদেশ পেয়ে সিনেটরের অফিস থেকে জেনারেল মেয়ার্সকে ডেকে এনেছিলেন। আমেরিকার এই দীর্ঘতম যুদ্ধের শুরু এবং শেষ—উভয় ক্ষেত্রেই ডোনাহুর উপস্থিতি এক অদ্ভুত কাকতালীয় বিষয় বলে মনে করেন ক্লিমো।
৯/১১-এর পর ইরাক যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অতিমারি মার্কিন সমাজকে নানাভাবে বিভক্ত করেছে। তবে ২৫ বছর পর এসেও ক্লিমো আশাবাদী। তিনি বিশ্বাস করেন, আমেরিকার মূল নীতি, স্বাধীনতা এবং সহনশীলতা অনড় এবং মার্কিন জনগণ আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে সক্ষম হবে।

