বিশিষ্ট লেখিকা ও অ্যাক্টিভিস্ট নাওমি ক্লেইন মনে করেন, অতিরিক্ত সম্পদ মানুষের মানসিকতায় এক ধরনের বিকৃত প্রভাব ফেলে, যা শেষ পর্যন্ত তাকে এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা আধিপত্যবাদে (supremacist) রূপান্তর করে। ক্লেইন শান্ত ও কৌতূহলীভাবে এই বার্তা দেন। তাঁর মুখে রয়েছে সদা প্রস্তুত হাসি। তবে ম্যানচেস্টারে তাঁর ২০২৩ সালের বই 'ডপেলগ্যাঙ্গার' (Doppelgänger) নিয়ে মঞ্চে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়ও তাঁর মধ্যে একই রকম শান্ত ও প্রফুল্ল ভাব দেখা গিয়েছিল, যে বইটিতে তিনি বর্ণনা করেছিলেন কীভাবে ডিজিটাল বিশ্ব আমাদের বাস্তবতার সাথে এবং একে অপরের সাথে সংযোগ ধ্বংস করছে। তাঁর নতুন বই ‘এন্ড টাইমস ফ্যাসিজম’-এর প্রকাশ উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের ধনকুবেরদের প্রভাব, জলবায়ু সংকট এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ক্লেইন এবং তাঁর সহ-লেখক, বিশিষ্ট অ্যাক্টিভিস্ট ও তথ্যচিত্র নির্মাতা অ্যাস্ট্রা টেলর যৌথভাবে এই বইটি লিখেছেন। মূলত দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি ভাইরাল নিবন্ধ থেকে এই বইটির উৎপত্তি। ক্লেইন জানান, গভীর ও অন্ধকার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার জন্য তিনি এবারই প্রথম যৌথভাবে কোনো বই লিখেছেন। তাঁর সহ-লেখক অ্যাস্ট্রা টেলর ব্যক্তিগত ঋণের বিরুদ্ধে সংহতি গড়ে তুলতে ‘ডেট কালেক্টিভ’ নামের একটি অনন্য উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা, যা মূলত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে।
বইটিতে বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিভিন্ন রূপ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনার অরাজক-উদারতাবাদী অর্থনীতি, রাশিয়ার মুক্ত গণমাধ্যম ধ্বংস করা, হাঙ্গেরিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয় (ভিক্টর অরবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত), ইতালির অভিবাসী-বিরোধী নব্য-ফ্যাসিবাদ, ব্রাজিলে জেইর বলসোনারো কর্তৃক ট্রান্স পরিচিতিকে হাতিয়ার করা এবং ভারতে নরেন্দ্র মোদির অধীনে ইসলামোফোবিয়া। তবে এই ফ্যাসিবাদের একটি ভিন্ন রূপ রয়েছে; এর প্রবক্তারা জলবায়ু পরিবর্তন এবং আর্থিক বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে এমন এক উত্তর-গণতান্ত্রিক বিশ্ব তৈরি করতে চান, যেখানে কেবল অল্প কয়েকজন ধনী ব্যক্তি টিকে থাকবেন। ক্লেইন বলেন, 'আমরা এখন এমন এক সময়ে আছি যখন একের পর এক সংকট ও বিপর্যয় আমাদের ক্রমাগত বিভ্রান্ত ও হতভম্ব করে তুলছে। এখানে স্থিতাবস্থা স্থির নয়, বরং দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, 'ইতিহাস পড়ার এক ধরনের তাগিদ মানুষের মধ্যে কাজ করে। আমরা এটি বারবার দেখেছি। যেমন ৯/১১-এর পর মানুষ হঠাৎ করেই ইতিহাস পড়তে শুরু করেছিল।'
সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সমালোচনা করে ক্লেইন বলেন, একসময় বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা সেখানে এসে দারিদ্র্য বিমোচন ও জলবায়ু নিয়ে নিজেদের ভালো কাজের গল্প শোনাতেন। তিনি সেই সময়টির কথা স্পষ্টভাবে স্মরণ করেন যখন স্কল ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ডসের মতো বিশাল সম্মেলনে সাংবাদিকদের আপ্যায়ন করা হতো এবং অত্যন্ত ধনী ব্যক্তিদের কেনিয়ার তৃণমূল পর্যায়ের বিশুদ্ধ পানির উদ্যোগে ২০,০০০ পাউন্ডের পুরস্কার বিতরণ করতে দেখা যেত। আর্থিক সংকটের আগের এবং ঠিক পরের সেই যুগে অন্তত এই ধরনের কিছু ভালো উদ্যোগের চেষ্টা ছিল। কিন্তু এখন তারা নির্লজ্জভাবে একটি ‘গণকবরের’ ওপর আবাসন ব্যবসার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। ক্লেইনের মতে, যখন বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং সামরিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা অল্প কিছু জবাবদিহিহীন মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়, তখন তারা সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টাও বন্ধ করে দেয়।
ধনকুবেরদের এই মানসিক পরিবর্তনের ইতিহাস টেনে ক্লেইন বলেন, 'এগুলো এমন প্রবণতা যা আমি দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে অনুসরণ করছি।' ১৯৯৯ সালে তাঁর বিখ্যাত বই 'নো লোগো' এবং পরবর্তীতে ২০০৭ সালের 'দ্য শক ডকট্রিন'-এর মাধ্যমে তিনি এই বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি ইরাক থেকে রিপোর্ট করার সময় দুর্যোগ ও শক থেকে জন্ম নেওয়া বেসরকারীকরণ এনক্লেভ বা সুরক্ষিত অঞ্চল দেখেছিলেন। বাগদাদের কেন্দ্রস্থলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত 'গ্রিন জোন' বা 'ইমারেল্ড সিটি' ছিল হ্যালিবার্টন এবং অন্যান্য বেসরকারি ঠিকাদারদের দ্বারা নির্মিত এমন একটি সুরক্ষিত এলাকা। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর থেকে করোনা মহামারির আগ পর্যন্ত পুঁজিবাদ ছিল একধরনের আয়েশি অবস্থায়। তখন ডাভোস বা অ্যাসপেনের মতো বড় বড় সম্মেলনে ধনকুবেররা সাধারণ মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মিয়ামির ফায়েনা হোটেলে পিটার থিলের আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ‘শত্রু’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় এবং একটি ‘মহাপ্রলয়’ থিমের পার্টিতে বর্ণবাদী ও অমানবিক নানা কস্টিউম পরে উল্লাস করা হয়। থিল ২০০৯ সালেই লিখেছিলেন যে, তিনি আর স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন না।
অন্যদিকে, ইলন মাস্ক বা জেফ বেজোসের মতো ধনকুবেরদেরও ভোলবদল হয়েছে। বেজোস একসময় জলবায়ু রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্টেডিয়ামের নাম রেখেছিলেন এবং মাস্ক নিজেকে উদ্ধারকর্তা বা সুপারহিরো ভাবতেন। কিন্তু এখন জলবায়ু রক্ষার সেসব প্রতিশ্রুতি উধাও হয়ে গেছে, তার জায়গায় এসেছে এক ধরনের চরম উদাসীনতা। মাস্কের এআই মডেল ‘গ্রোক’ পরিচালনার জন্য মেমফিসে ৩৫টি গ্যাস টারবাইন বসিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পানি অপচয় করা হচ্ছে, যা স্থানীয় পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। ক্লেইন বলেন, এই ধনী ব্যক্তিরা যে জলবায়ু পরিবর্তন বোঝেন না তা নয়, বরং তারা খুব ভালো করেই জানেন তারা কী করছেন।
মার্ক জাকারবার্গ বা বেজোসের মতো ব্যক্তিরা মূলত ব্যবসার স্বার্থে নিজেদের রূপ পরিবর্তন করেন। ডটকম যুগের শুরুতে এই ধনকুবেরদের যখন ঈশ্বরের মতো পুজো করা হতো, তখন থেকে তাদের মধ্যে এক ধরনের অহংকার তৈরি হয়েছে। ক্লেইনের মতে, বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার পর নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবার গল্প তৈরি করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না।
তবে এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন ক্লেইন। তিনি মেমফিসে মাস্কের ‘কলোসাস ২’ ডাটা সেন্টারের বিরুদ্ধে কিশোন পিয়ারসন এবং জাস্টিন পিয়ারসনের আন্দোলনের উদাহরণ দেন। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের সাথে যুক্ত হয়ে মেমফিস কমিউনিটি এগেইনস্ট পলিউশন ইতিমধ্যে তেল পাইপলাইন ও ক্ষতিকারক রাসায়নিকের বিরুদ্ধে বড় জয় পেয়েছে।
ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ‘ইয়েটজাইট’ বা ‘এখনকার সময়’ ধারণার উল্লেখ করে ক্লেইন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের দ্রুত রুখে দাঁড়াতে হবে। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বন্য প্রকৃতির কাছাকাছি বসবাস করা এই লেখিকা বলেন, আকাশে যখন ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট বা ‘মহাকাশের পোকা’ ঘুরে বেড়াতে দেখেন, তখন তাঁর ভীষণ ক্ষোভ জন্মায়। তিনি বলেন, “আমাদের গভীরতম ভালোবাসার জায়গাগুলো খুঁজে নিতে হবে এবং জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করতে হবে।”

