ফিলিপাইনে একটি যাত্রীবাহী ফেরিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা লাফিয়ে ৭৬ জনে দাঁড়িয়েছে। শনিবার কোস্টগার্ড পুড়ে যাওয়া ওই নৌযান থেকে আরও ৪১ জনের মরদেহ উদ্ধারের পর এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। কোস্টগার্ডের মুখপাত্র কমোডর নোয়েমি কায়াবিয়াব এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত এই অবশিষ্টাংশগুলো পালাওয়ানের করন বন্দরের একটি ঘাটে নিয়ে যাওয়া হবে।
এম/ভি জুন অ্যাস্টার নামের এই ফেরিটি গত বুধবার অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়। বর্তমানে এটি উপকূল থেকে প্রায় ৭.৫ কিলোমিটার (৪.৫ মাইল) দূরে আটকে রয়েছে। শনিবার প্রথম দফায় সমুদ্রপথে ৩০টি মরদেহ এসে পৌঁছানোর পর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা নিহতদের শনাক্তকরণের জটিল প্রক্রিয়া শুরু করেন। নিশ্চিত হওয়া ৭৬ জন মৃতের মধ্যে ঘটনার পরপরই উদ্ধার হওয়া ৫ জনের মরদেহও রয়েছে।
করন শহরের একটি কবরস্থানে নিহতদের সাময়িকভাবে সমাহিত করার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মীরা কফিন নিয়ে যাচ্ছেন। করন শহরের পর্যটন কর্মকর্তা ও সরকারি মুখপাত্র ক্রিস্টিন আব্লানা সাংবাদিকদের জানান, ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিহতদের দেহাবশেষ সংরক্ষণের জন্য এক মিটার (তিন ফুট) গভীর কবর খনন করা হয়েছে। স্বজনদেরকে নিহতদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দেখে শনাক্ত করার জন্য আনা হবে। তিনি বলেন, যদি কেউ ছবি বা জিনিসপত্র দেখে নিশ্চিত করতে পারেন যে এগুলো তাদের স্বজনের, তবে তাদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা নেওয়া হবে।
কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দুই চিলির নাগরিকসহ ৩০ জন যাত্রী এবং ১৩ জন ক্রু সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনও প্রায় ডজনখানেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করে কোস্টগার্ডের মুখপাত্র কায়াবিয়াব একটি রেডিও সাক্ষাৎকারে জানান, ফেরির কার্গো হোল্ড (পণ্য রাখার জায়গা) থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল এবং মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তা পুরো জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে। বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, "একটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর ধোঁয়া দেখা যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা লাইফ জ্যাকেট পরারও সময় পাননি।"
ঘাটের কাছে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষারত মানুষের মাঝে নেমে এসেছে চরম শোক। ৪০ বছর বয়সী জোসেনিত মায়ো অশ্রুসজল চোখে জানান, তার মেয়ে ম্যানিলা থেকে পরিবারের সাথে দেখা করতে এই ফেরিতে আসছিল। তিনি বলেন, "সে আমাকে বলেছিল, 'মা, আমি বাড়ি আসতে চাই, ভাইবোনদের খুব মনে পড়ছে।' ও খুব একাকীত্বে ভুগছিল।"
অন্যদিকে, মাইরা কাবিলান তার নিখোঁজ ভাই রামেল গঞ্জাগার (৪০) খোঁজে করন শহরে ছুটে এসেছেন। ম্যানিলা থেকে ভগ্নিপতির সাথে ব্যবসায়িক কাজে ফেরিটিতে চড়েছিলেন রামেল। মাইরা বলেন, "এক মাস আগেই ওর স্ত্রী কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। মেয়ে হওয়ায় ও খুব খুশি ছিল। ভোর পর্যন্ত ভাবছিলাম ও হয়তো বেঁচে আছে, কিন্তু এখন আশা ছেড়ে দিয়েছি।"
নিখোঁজদের খবরের জন্য ব্যাকুল শত শত মানুষ স্থানীয় মেয়রের ফেসবুক পেজে মন্তব্য করে স্বজন, বন্ধু এমনকি একটি পোষা কুকুরের সন্ধান চালাচ্ছেন। ১১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের এই দ্বীপরাষ্ট্রে ফেরি দুর্ঘটনা অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। ৭ হাজারের বেশি দ্বীপের মধ্যে যাতায়াতের জন্য মানুষ সস্তা এবং দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত নৌযানের ওপর নির্ভর করে থাকে। এর আগে গত জানুয়ারিতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ৩৪০ জনেরও বেশি যাত্রী নিয়ে একটি তিন তলা ফেরি ডুবে গেলে অন্তত ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

