ইউক্রেনের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রগুলোতে রাশিয়া তাদের উসকানিমূলক তৎপরতা আরও জোরদার করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। সম্প্রতি ইউক্রেন-মলদোভা এবং পোল্যান্ড-ইউক্রেন সীমান্তে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনাকে এই সম্ভাব্য উসকানির পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন তিনি।
ডোনাল্ড টাস্ক জানান, গত মঙ্গলবার রাতে ইউক্রেন ও মলদোভার মধ্যকার স্টারোকোজাচি সীমান্ত ক্রসিংয়ে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, বুধবার রাতে পোল্যান্ড-ইউক্রেন সীমান্ত ক্রসিংয়ে একটি সরাসরি হুমকি তৈরি হলেও ওয়ারশ এবং কিয়েভের যৌথ সহযোগিতায় তা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে এই হুমকির বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য বা রাশিয়ার সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তিনি প্রকাশ করেননি।
স্লোভাকিয়ার ব্রাতিসলাভায় মধ্য ইউরোপীয় দেশ এবং আয়ারল্যান্ডের একটি বৈঠক চলাকালীন বৃহস্পতিবার ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র (CIA) পরিচালক জিম র্যাটক্লিফের কাছ থেকে তিনি এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন পেয়েছেন। র্যাটক্লিফ সম্প্রতি মস্কো সফর করেছিলেন। টাস্ক বলেন, রাশিয়া ইতিমধ্যেই মলদোভার মতো সীমান্ত ক্রসিংগুলোতে উসকানিমূলক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পোল্যান্ডসহ ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী অন্যান্য দেশেও একই ধরনের তৎপরতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিআইএ পরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ব সীমান্তে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য ইউরোপের প্রস্তুত থাকা উচিত।
ইউক্রেনের সাথে পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া এবং মলদোভার সীমান্ত রয়েছে। মলদোভা সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। গত ২০ আগস্ট মলদোভার দক্ষিণাঞ্চলীয় জিউরজিউলেস্টি সীমান্ত ক্রসিং থেকে প্রায় ১৫০ মিটার (৪৯০ ফুট) দূরে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে একটি বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে সৃষ্ট আগুন মলদোভা সীমান্তের প্রায় ১০০ বর্গ মিটার (১,০৭৬ বর্গ ফুট) এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সেদিনই সীমান্ত পুলিশ মলদোভা ভূখণ্ডে প্রায় ১ কিলোমিটার (০.৬২ মাইল) দূরে একটি গর্ত এবং রাশিয়ার ব্যবহৃত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায়। এর পরদিন রাশিয়ার হামলার কারণে মিরনো সীমান্ত সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২৫ আগস্ট ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন ইউক্রেনীয় অংশে আঘাত হানার পর ভলকানেস্টি সীমান্ত ক্রসিংয়ের কার্যক্রম স্থগিত করে মলদোভা। সীমান্ত পুলিশ নাগরিকদের ড্রোন বা বিস্ফোরণের শব্দ শুনলে শান্ত থাকতে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
গত মঙ্গলবারের স্টারোকোজাচি সীমান্ত ঘটনার পর মলদোভার পশ্চিমাঞ্চলপন্থী প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু রাশিয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, মস্কোর বর্বর যুদ্ধ তাদের সীমান্তে এসে পৌঁছেছে। তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যখন মৃত্যু ছড়াচ্ছে এবং মলদোভাকে বিপদে ফেলছে, তখন সেই বিপদ অস্বীকার করা এবং দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার সমালোচনা করা নিজের মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে বিশ্বাসঘাতকতাকে বেছে নেওয়ার শামিল।
এদিকে গত সপ্তাহে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, দানিউব নদী বরাবর ন্যাটো সদস্য দেশ রোমানিয়ার সীমান্তবর্তী একটি ক্রসিং এবং রপ্তানি অবকাঠামো ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। চলতি বছরে রোমানিয়ার আকাশসীমায় ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে এবং তাদের ভূখণ্ডে দ্বিগুণ ড্রোন ও ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। টাস্ক কয়েক সপ্তাহ ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, রাশিয়া পোল্যান্ড বা বাল্টিক অঞ্চলের তিন দেশ—এস্তোনিয়া, লাটভিয়া এবং লিথুয়ানিয়ার বিরুদ্ধে সীমিত সামরিক বা হাইব্রিড উসকানি চালাতে পারে।
এই নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পোল্যান্ডের সহযোগিতা জোরদার হচ্ছে। গত মঙ্গলবার পোল্যান্ডের গোয়েন্দা সেবা তদারককারী মন্ত্রী তোমাস সিমোনিয়াক ভার্জিনিয়ায় সিআইএ সদর দফতরে জিম র্যাটক্লিফের সাথে বৈঠক করেন। এছাড়া, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের উইলিয়াম ক্যাপেলেটি জুনিয়র এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের থমাস ডিনানোর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার পোল্যান্ড সফর করছে। তারা দেশটিতে একটি স্থায়ী মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাব্য স্থানগুলো পরিদর্শন করছেন। পোল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার হুমকি মোকাবেলায় একটি স্থায়ী মার্কিন ঘাঁটির দাবি জানিয়ে আসছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিবেচনা করছে।

