রাশিয়ার প্রধান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) বুধবার জানিয়েছে, তারা মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা, মালিক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পাভেল দুরভের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সহায়তার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এনেছে। একই সঙ্গে তাকে একটি আন্তর্জাতিক ওয়ান্টেড তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এফএসবি তাদের বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে যে, টেলিগ্রাম প্রশাসন প্ল্যাটফর্ম থেকে অসংখ্য চ্যানেল, চ্যাট এবং বট অপসারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও চরমপন্থী সংগঠন এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে রাশিয়ায় নাশকতা, সন্ত্রাসবাদ, গণহত্যা এবং সাইবার জালিয়াতির মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও সমন্বয় করছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে রাশিয়ায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন বলে এফএসবি উল্লেখ করেছে।
রাশিয়ায় এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে পাভেল দুরভের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। টেলিগ্রামের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, টেলিগ্রামের সদর দপ্তর দুবাইয়ে অবস্থিত এবং দুরভ সেখানে বসবাস করেন। তিনি ফ্রান্স এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বৈত নাগরিক।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে দুরভ জানিয়েছিলেন যে, রুশ কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে। তিনি তখন অভিযোগ করেছিলেন যে, টেলিগ্রামের গোপনীয়তা এবং বাকস্বাধীনতা দমনের অংশ হিসেবে তাকে ফাঁসানোর জন্য এসব অজুহাত তৈরি করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনামলে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা বিভিন্ন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আইন অমান্যকারী প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করেছে এবং অনলাইন ট্রাফিক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে অনেক সময় নিষেধাজ্ঞা এড়ানো সম্ভব হয়, তবে কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে সেগুলোও ব্লক করার চেষ্টা চালায়।
টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে রাশিয়ার এই কঠোর অবস্থানে দেশটিতে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এ বছর রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চেষ্টা করা হলেও কর্তৃপক্ষ তা দমন করেছে। এছাড়া সামরিক ব্লগাররাও এই অভিযানের সমালোচনা করে বলেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনাদের যোগাযোগ এবং মস্কোর বাহিনীর সহায়তায় ক্রাউডফান্ডিং ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য অ্যাপটি অপরিহার্য।
যদিও সরকার শুরুতে যুদ্ধের ময়দানে টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তবে পরে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে ভিন্ন বার্তা আসে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে পুতিনের সঙ্গে এক বৈঠকে এক নারী সেনা সদস্য টেলিগ্রামকে একটি 'বৈরী যোগাযোগ মাধ্যম' হিসেবে অভিহিত করেন। তখন পুতিনও একমত পোষণ করে বলেন, 'আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই এমন যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করা যুদ্ধের ময়দানে কর্মীদের জন্য বিপজ্জনক।'
উল্লেখ্য যে, পাভেল দুরভ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন। ২০২৪ সালে প্যারিসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তার প্ল্যাটফর্মে মাদক পাচার এবং শিশু যৌন নির্যাতনের ছবি ছড়ানোর মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ তখন তাকে প্রাথমিক অভিযোগপত্র দেয়। সে সময় ক্রেমলিন দুরভের বিরুদ্ধে ফরাসি কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপকে 'নির্বাচনী' বা পক্ষপাতমূলক বলে সমালোচনা করেছিল। মার্চ ২০২৫-এ টেলিগ্রামের সিইও জানিয়েছিলেন যে, ফ্রান্সে কয়েক মাস কাটানোর পর তিনি দুবাইয়ে ফিরে এসেছেন।
এই প্রতিবেদনটি সংশোধন করা হয়েছে যাতে সম্ভাব্য শাস্তির মেয়াদ ১৫ বছর নয়, বরং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড তা স্পষ্ট করা হয়েছে।

