স্পেনে আবাসন সংকট নিয়ে দেশব্যাপী তীব্র বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেওয়া ৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা মারিকারমেন আবাসকাল মারা গেছেন। মাদ্রিদের ভাড়াটিয়া ইউনিয়ন (টেন্যান্টস ইউনিয়ন) তাঁর মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ভাড়া বৃদ্ধিজনিত জটিলতায় মাদ্রিদের নিজের দীর্ঘ ৭০ বছরের পুরোনো ফ্ল্যাট থেকে মারিকারমেনকে জোরপূর্বক স্ট্রেচারে করে উচ্ছেদ করা হয়েছিল।
উচ্ছেদের পর তীব্র প্রতিবাদের মুখে ফ্ল্যাটটির মালিক কোম্পানি তাঁকে কম ভাড়ায় ফিরে আসার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তিনি সেই নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেননি। মাদ্রিদ টেন্যান্টস ইউনিয়নের মুখপাত্র আলিসিয়া দেল রিও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আবাসন নিয়ে মুনাফালোভী ব্যবসা মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। আজ আমাদের সহকর্মী মারিকারমেনকে এই লোভই হত্যা করল, তবে তাঁর স্মৃতি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে।" ইউনিয়ন এই ঘটনাকে দেশের ইতিহাসের একটি বড় মোড় হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মারিকারমেনের বাবা ১৯৫৬ সালে প্রথম মাদ্রিদের এই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিলেন। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তিনি সেখানে বসবাস চালিয়ে যান এবং দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভাড়ার ওপর একটি নির্দিষ্ট সীমা বা ক্যাপ নির্ধারিত ছিল। তবে ২০১৮ সালে আবাসন কোম্পানি 'উর্বাখেস্তিওন' (Urbagestión) ভবনটি কিনে নেওয়ার পর নাটকীয়ভাবে ভাড়া বৃদ্ধি করে। মাসিক ৫০০ ইউরো থেকে বাড়িয়ে ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ২,৬৫০ ইউরো। পরবর্তীতে কোম্পানিটি ভাড়া কমিয়ে ১,৬৫০ ইউরো করার প্রস্তাব দিলেও তা ছিল মারিকারমেনের মাসিক পেনশনের চেয়ে ৩০০ ইউরো বেশি।
এর আগে তিনবার মারিকারমেনকে উচ্ছেদের চেষ্টা আদালতের হস্তক্ষেপে আটকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। হাসপাতাল থেকে রেকর্ড করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছিলেন, "আমি আমার নিজের বাড়ি রক্ষা করতে পারিনি ঠিকই, তবে লড়াই করেছি যাতে অন্যরা নিজের অধিকারের জন্য লড়তে শেখে।"
তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মাদ্রিদের বিখ্যাত পুয়ের্তা দেল সল চত্বরে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শত শত বিক্ষোভকারী পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রা করে স্লোগান দেন, "লড়াই চলবে, মারিকারমেন আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন।" ২৫ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী নোরা বোমঘাইত বলেন, "তিনি মারা গেলেও যে লড়াই শুরু হয়েছে তা থামবে না। ক্ষমতায় কে আছে তা আমাদের কাছে বড় বিষয় নয়।" আবাসন সংস্কারের দাবিতে আগামী ১১ নভেম্বর দেশজুড়ে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ইউনিয়নগুলো।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্পেনের রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। মারিকারমেনের উচ্ছেদের পর আবাসন সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের বামপন্থী জোট সরকারের আনা জরুরি আবাসন বিল গত সপ্তাহে পার্লামেন্টে পাস হতে ব্যর্থ হয়। এর জের ধরে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী সানচেজ আগামী ২৯ নভেম্বরের জন্য আগাম সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করেন। ডানপন্থী দলগুলো সরকারের এই আবাসন বিলের বিরোধিতা করে আসছিল। তাদের দাবি, বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপের ফলে ভাড়া দেওয়ার মতো বাড়ির সংখ্যা কমে যাবে এবং ভাড়ার দাম আরও বৃদ্ধি পাবে।
মারিকারমেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, "মারিকারমেনের পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা। যারা আজ এই ক্ষতিকে নিজেদের মনে করছেন, তাদের সবাইকে আমি জড়িয়ে ধরছি।" অন্যদিকে, বিরোধী দল পিপি পার্টির নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইহো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক জানিয়ে বলেন, "কোনো রাজনীতি বা স্বার্থান্বেষী প্রচারণা নয়, একজন মানুষের মৃত্যুর সামনে কেবল শ্রদ্ধাটুকুই কাম্য।"

