আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা মনে করেন সব সমস্যার সমাধান তাদের জানা আছে। কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে কথা বলা শুরু করলেই আমাদের ভেতরের সেই সত্তাটি জেগে ওঠে, যাকে ‘দ্য কোচিং হ্যাবিট’ বইয়ের লেখক মাইকেল বাঙ্গে স্ট্যানিয়ার তাঁর টেড টকে ‘অ্যাডভাইস মনস্টার’ বা ‘পরামর্শের দানব’ বলে অভিহিত করেছেন। স্ট্যানিয়ার ব্যাখ্যা করেন, "যখন কেউ কথা বলা শুরু করে, তখনই এই পরামর্শের দানবটি জেগে ওঠে এবং আমরা ভাবতে শুরু করি যে এবার আমাদের কথা বলার পালা। আমরা মনে করি আমাদের কাছে সব উত্তর আছে এবং আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। মানুষের এই প্রবণতাটি কখনো কখনো দরকারী হলেও, অনেক সময় তা ক্ষতিকর অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।"
সহজ মনে হলেও কাউকে পরামর্শ দেওয়ার আগে তার অনুমতি নেওয়া উচিত বলে মনে করেন স্ট্যানিয়ার। কলামিস্ট বার্বিয়েরি তাঁর সন্তানদের সাথে কথা বলার সময় একটি চমৎকার বাক্য ব্যবহার করেন, "তুমি কি আমার পরামর্শ চাও, নাকি শুধু মনের ক্ষোভ ঝাড়তে চাও?" স্ট্যানিয়ার তাঁর ‘দ্য অ্যাডভাইস ট্র্যাপ’ বইয়ে লিখেছেন, পরামর্শ দেওয়া খারাপ কিছু নয়; কিন্তু সব পরিস্থিতিতেই দ্রুত পরামর্শ দেওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে তা সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ মানুষ সবসময় জাদুকরী কোনো সমাধান খোঁজে না, বরং তারা চায় কেউ তাদের কথা শুনুক, বুঝুক এবং তাদের উৎসাহিত করুক। খুব দ্রুত পরামর্শ দিতে গেলে এমন একটি বার্তা যায় যে আমরা নিজেদের বেশি বুদ্ধিমান বা দক্ষ মনে করছি, যা এক ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে এবং মানুষ সেই পরামর্শ গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে।
লন্ডন ক্লিনিকের মনোবিজ্ঞানী ড. লি ভালস বলেন, মানুষ যখন মনে করে যে তারা নিজেরাই কোনো সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছে, তখন তারা সেই পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে বেশি আগ্রহী হয়। তাই ধৈর্য ধরে কথা শোনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দিলে দেখা যায়, যে সমস্যাটি সামনে আসছে তা আসল সমস্যা নয়, বরং এর পেছনে অন্য কোনো বড় সংকট লুকিয়ে থাকতে পারে। এই আসল সমস্যাটি জানার জন্য স্ট্যানিয়ার সবসময় কৌতূহলী থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে "এই বিষয়টি তোমার জন্য কেন কঠিন মনে হচ্ছে?" বা "আসলে কী ঘটছে?" অথবা "তুমি নিজে এ ব্যাপারে কী ভেবেছ?"—এ ধরনের প্রশ্ন করা যেতে পারে। এতে অপরপক্ষ নিজে উদ্যোগী হতে পারে এবং তাদের ইতিমধ্যে জানা কোনো বিষয় নতুন করে বলতে হয় না।
বার্বিয়েরি লক্ষ্য করেছেন যে, মানুষের প্রত্যাশা যখন বাস্তবতার সাথে মেলে না, তখনই তারা বেশি সমস্যায় পড়ে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাথে তুলনা করার কারণে গত ১০ বছরে মানুষের প্রত্যাশা বাস্তবতার চেয়ে অনেক দূরে সরে গেছে। তাই কেউ যখন তার সঙ্গীর কোনো আচরণ নিয়ে অভিযোগ করে, তখন "এটা তো খুবই খারাপ, তোমার এমন করা উচিত" না বলে "তুমি কি আসলেই এমন অনুভব করতে চাও?"—এভাবে প্রশ্ন করা উচিত। এতে ইতিমধ্যে মানসিক চাপে থাকা মানুষের ওপর বাড়তি কোনো দায়িত্ব চাপানো হয় না।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর গবেষক ইয়িতং ঝাও এবং তাঁর দল সম্প্রতি রোমান্টিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমাতে পরামর্শ দেওয়ার দুটি পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেছেন। প্রথমটি হলো ‘কমিটমেন্ট টু দ্য প্রবলেম’ বা সমস্যার প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল থাকা, যেখানে অপরপক্ষের অনুভূতিকে অবহেলা না করে তাদের পাশে থাকা হয় এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়া হয়। যেমন: "পরিস্থিতি কঠিন, তবে এখান থেকে কি তোমার কিছু শেখার আছে?" দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো ‘ডিকমিটমেন্ট’ বা এড়িয়ে যাওয়া, যেখানে "পরিস্থিতি যতটা ভাবছ ততটা খারাপ নয়" বা "এটি তোমার নিয়ন্ত্রণে নেই"—এ ধরনের কথা বলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম পদ্ধতিটি মানুষকে বেশি সমর্থিত ও কম বিচারগ্রস্ত অনুভব করায়। অন্যদিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে অপরপক্ষ মনে করতে পারে যে তাদের অনুভূতিকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বা তারা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতা বা পক্ষপাতিত্ব কাজ করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ড. ভালস। তিনি বলেন, আমরা বন্ধু বা ভাইবোন যেই হই না কেন, আমাদের পরামর্শ আমাদের নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই পক্ষপাতের কারণে আমরা মনে করি যে আমরাই অপরপক্ষের জন্য সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারি, যা সবসময় তাদের জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে।
শিশু মনোবিজ্ঞানী ড. মার্গট সান্ডারল্যান্ড, যিনি ‘হোয়াট এভরি প্যারেন্ট নিডস টু নো’ এবং ‘কনভারসেশনস দ্যাট ম্যাটার’ বইয়ের লেখক, শিশুদের পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাবা-মাকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, সন্তানরা যখন কোনো সমস্যা নিয়ে আসে, তখন তাদের তিরস্কার বা রাগ দেখানো উচিত নয়। এতে তারা পরবর্তীতে আর বাবা-মার কাছে আসবে না এবং নিজেরাই ক্ষতিকর উপায়ে সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে আত্মহনন বা স্ব-ক্ষতির পথ বেছে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে উভয়েরই শান্ত থাকা প্রয়োজন। সন্তান যদি রেগে রুম থেকে চলে যায় বা টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ে, তবে তাকে কিছুক্ষণ সময় দেওয়া উচিত। সান্ডারল্যান্ড একে ‘তাড়াহুড়ো না করে ধীরস্থির হওয়া’ বা ‘হাড়ি স্লোলি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর নিজের সন্তানদের সাথে একটি খেলা খেলতেন, যেখানে খেলনা বিড়ালটিকে লেগো ঘরের ওপর রাখলে বোঝা যেত যে সন্তান কথা বলতে প্রস্তুত। এছাড়া কাগজে ছবি এঁকে সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে, যা সরাসরি কথোপকথনের চাপ কমিয়ে দেয়।
সব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নাও থাকতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে "আমি জানি না" বলাটা কোনো ভুল নয় বলে মনে করেন বার্বিয়েরি। প্রয়োজনে কোনো বই, পডকাস্ট বা থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। ড. ভালস বলেন, আমরা অনেক সময় এমন মানুষের কাছে যাই যারা আমাদের মতামতকে সমর্থন করবে, কিন্তু আসলে একজন নিরপেক্ষ মানুষের পরামর্শ বেশি কাজে আসে।
বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটজিপিটি খুব দ্রুত এবং কোনো ব্যক্তিগত জড়িয়ে পড়া ছাড়াই তথ্য ও রেফারেন্সসহ পরামর্শ দিতে পারে। তবে স্ট্যানিয়ার মনে করেন, এআই-এর এই দক্ষতার কারণে মানুষ দিন দিন আরও একাকী হয়ে পড়ছে, যা সমাজের জন্য একটি বড় ক্ষতি। মানুষের মতো এআই যত্ন সহকারে খোঁজ নিতে পারে না। সান্ডারল্যান্ড বলেন, পরামর্শ দেওয়ার পর বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে যায় না। কিছুদিন পর আবার খোঁজ নিয়ে জিজ্ঞেস করা উচিত, "সেদিনের আলোচনার পর এখন পরিস্থিতি কেমন?" সবশেষে, একজন ভালো পরামর্শদাতা হয়ে ওঠার জন্য স্ট্যানিয়ার ফিডব্যাক বা মতামত নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, "জিজ্ঞেস করুন, আমার কোনো পরামর্শ কি তোমার কাজে লেগেছে? সাধারণত আপনি যে বিষয়টি সবচেয়ে কম আশা করেছিলেন, সেটিই হয়তো তাদের সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে।"

