ঐতিহাসিক এনতেবে জিম্মি উদ্ধার অভিযানের প্রায় ৫০ বছর পর, সেই অভিযানে নিহত ইসরায়েলি কমান্ডো ইয়োনাথান নেতানিয়াহুর একটি স্মারক ভাস্কর্য উন্মোচন করেছে উগান্ডা। ইয়োনাথান ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় ভাই। উগান্ডার এনতেবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পুরনো টার্মিনালের বাইরে, যেখানে এই শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, সেখানেই মূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছে। ভাস্কর্যটিতে তাকে হাতে একটি মেশিনগান নিয়ে বীরদর্পে এগিয়ে যাওয়ার ভঙ্গিমায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মূর্তিটি উন্মোচন করে উগান্ডার সেনাপ্রধান জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবা বলেন, এই স্মৃতিস্তম্ভটি ইয়োনাথানের সাহস এবং নিঃস্বার্থ সেবাকে সম্মান জানাতে তৈরি করা হয়েছে। ঐতিহাসিক এই অভিযানকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যকার বর্তমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এক অসাধারণ যাত্রার ফসল। অর্ধশতাব্দী আগের সেই ঘটনাকে উগান্ডার ইতিহাসের একটি "বেদনাদায়ক অধ্যায়" হিসেবে উল্লেখ করলেও তিনি যোগ করেন যে, বর্তমানে উগান্ডা ও ইসরায়েলের সম্পর্ক পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে।
১৯৭৬ সালের সেই ঘটনায় তেল আবিব থেকে উড্ডয়ন করা এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমান দুজন ফিলিস্তিনি ও দুজন জার্মান অপহরণকারী মিলে হাইজ্যাক করে উগান্ডায় নিয়ে যায়। অপহৃত বিমানটি প্রথমে লিবিয়ায় জ্বালানি সংগ্রহ করে এবং পরে উগান্ডায় অবতরণ করলে তৎকালীন উগান্ডান স্বৈরশাসক ইদি আমিন তাদের স্বাগত জানান। অপহরণকারীরা জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে ৫০ লাখ ডলার এবং ইসরায়েল, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও কেনিয়ায় বন্দি থাকা ৫৩ জন চরমপন্থির মুক্তি দাবি করে। পরবর্তীতে ৩০ জুন ও ১ জুলাই কিছু জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হলেও ইসরায়েলি ও ইহুদিদের আটকে রাখা হয়।
এরপর ৩ জুলাই কেনিয়া হয়ে ইসরায়েলের বিশেষ কমান্ডো বাহিনী এনতেবেতে অবতরণ করে মাত্র ৯০ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে এক সফল অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে ১০০ জনেরও বেশি জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে উদ্ধার অভিযান চলাকালীন একমাত্র ইসরায়েলি সেনা হিসেবে নিহত হন ইয়োনাথান নেতানিয়াহু। এছাড়া জিম্মিদের মধ্যে জঁ-জ্যাক মিমুনি, পাসকো কোহেন এবং ইদা বোরোচোভিচ নামে তিন ব্যক্তি অভিযানের সময় প্রাণ হারান। ডোরা ব্লচ নামের আরেক জিম্মি উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় পরে খুন হন।
সেনাপ্রধান কাইনেরুগাবা নিহত জিম্মিদের স্মরণ করে বলেন, "তাদের স্মৃতি যেন শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার অন্বেষণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।" এই রক্তক্ষয়ী অভিযানে চার অপহরণকারী এবং তাদের সহযোগী আরও তিনজন নিহত হয়। এছাড়া ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে অন্তত ৪৫ জন উগান্ডান সেনাও প্রাণ হারান। উগান্ডান সেনাদের মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করে কাইনেরুগাবা বলেন, তারা বীরত্বের সাথে লড়াই করেছিলেন কারণ তারা বিশ্বাস করতেন যে তাদের উদ্দেশ্য সঠিক ছিল। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "আজ আমরা জানি যে ইদি আমিনের সরকার, যার অধীনে তারা কাজ করেছিলেন, সেটি ছিল একটি নির্মম একনায়কতন্ত্র, যা উগান্ডার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করত না।"
এই উদ্ধার অভিযান ইসরায়েলে অত্যন্ত প্রশংসিত হলেও ইদি আমিনের জন্য তা ছিল চরম অপমানজনক। এক দশক আগে এনতেবে সফরকালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, "আমি আমার ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছি যে সন্ত্রাসীদের পরাস্ত করতে দুটি জিনিসের প্রয়োজন: স্পষ্টতা এবং সাহস।"

