দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের একটি কমিটির বৈঠকে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক 'ডি-ডে' অবতরণ সৈকত এবং গ্রিসের ঐতিহ্যবাহী অলিম্পাস পর্বতকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে আগামী বুধবার পর্যন্ত চলমান এই বৈঠকে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানকে এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় যুক্ত করা হয়।
নতুন যুক্ত হওয়া স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে জাপানের প্রাচীন রাজধানী আসুকা ও ফুজিওয়ারা এবং দক্ষিণ সুদানের 'বোমা-বাদিংগিলো মাইগ্রেটরি ল্যান্ডস্কেপ'। দক্ষিণ সুদানের জন্য এটিই প্রথম বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণীর অভিবাসন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
ফ্রান্সের নরম্যান্ডি অঞ্চলের পাঁচটি অবতরণ সৈকত— ওমাহা, ইউটা, সোর্ড, গোল্ড এবং জুনো— এই স্বীকৃতির আওতায় এসেছে। ১৯৪৪ সালের ৬ জুন এই সৈকতগুলোতেই ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মিত্রবাহিনীর সেনা অবতরণ করেছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছে পয়েন্ট দু হক নামক স্থানটিও, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি দখলদারিত্ব থেকে পশ্চিম ইউরোপকে মুক্ত করার অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস (আইসিওএমওএস) জানিয়েছে, এখানে জার্মান দুর্গ, বোমার ক্ষতচিহ্ন, মিত্রবাহিনীর বন্দর কাঠামো এবং ডুবে যাওয়া জাহাজের মতো বহু ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, যা ইউরোপে শান্তি ও স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার প্রতীক। তবে পর্যটন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বায়ুকল (উইন্ড ফার্ম) নির্মাণের মতো ঝুঁকির কারণে এই স্থানগুলোর সুরক্ষায় আরও জোরদার পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। ইউনেস্কোয় ফ্রান্সের স্থায়ী প্রতিনিধি আহলেম ঘারবি বলেন, এই স্বীকৃতি বিশ্বজুড়ে চলমান সংকট ও যুদ্ধের সময়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাসবিদ ডেভিড এজারটন এই অবতরণকে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা উভচর অবতরণ হিসেবে উল্লেখ করে এটি স্মরণ রাখার তাগিদ দেন।
গ্রিসের সর্বোচ্চ পর্বত অলিম্পাসকে (উচ্চতা ২,৯১৮ মিটার বা ৯,৫৭৩ ফুট) বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে দেশটির ১২ বছরের দীর্ঘ প্রচেষ্টার সফল সমাপ্তি ঘটল। গ্রিক পুরাণে বর্ণিত ১২ জন অলিম্পিয়ান দেব-দেবীর এই পৌরাণিক আবাস্থলটি একই সাথে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। অলিম্পাস পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত ডিওন-অলিম্পাস পৌরসভার মেয়র ইভানজেলোস গেরোলিওলিওস বলেন, এই স্বীকৃতি পর্যটনের চাপ মোকাবিলা করে পরিবেশ রক্ষায় আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউনেস্কোয় গ্রিসের প্রতিনিধি গেওর্গিওস কুমোৎসাকোস বলেন, আমরা অলিম্পাস পর্বত সুরক্ষায় আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি। গ্রিক পুরাণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেবতাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
জাপানের নারা প্রিফেকচারের ১৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নিয়ে গঠিত আসুকা ও ফুজিওয়ারা অঞ্চলটি ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রাচীন জাপানি শাসনব্যবস্থার সাক্ষ্য বহন করে। চীনের আদলে জাপানে প্রথম কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে এর সাথে। নারা ইউনিভার্সিটির প্রত্নতত্ত্বের অধ্যাপক ইয়োশিইউকি আইহারা জানান, ধানের জমির মাত্র ১ মিটার নিচে এই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষগুলো চাপা পড়ে রয়েছে, যা চীন ও কোরিয় উপদ্বীপের প্রভাবে গড়ে উঠেছিল। জাপানের সংস্কৃতি বিষয়ক উপমন্ত্রী শিগেকি কোবায়াশি এই স্বীকৃতির জন্য কমিটিকে ধন্যবাদ জানান এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ আশা প্রকাশ করেন যে, এই স্বীকৃতি অঞ্চলটিতে পর্যটনকে আরও চাঙ্গা করবে।
দক্ষিণ সুদানের বোমা-বাদিংগিলো অঞ্চলে রয়েছে বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও তৃণভূমি, যেখানে প্রতি বছর আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রায় ৬০ লাখ হোয়াইট-ইয়ার্ড কব, টিয়াং এবং মঙ্গোল্লা হরিণ পরিযায়ী যাতায়াত করে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলটি হাতি, সিংহ ও চিতার মতো বন্যপ্রাণীর আবাস্থল এবং এখানে শত শত বছর ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী পশুপালন, চাষাবাদ ও মাছ শিকার করে জীবনধারণ করছে।

