৩০ বছর ছুঁইছুঁই এক তরুণ চরম একাকীত্ব, কুমারত্ব এবং মানসিক অবসাদের কারণে পুরুষদের উগ্র অনলাইন গোষ্ঠী বা 'ম্যানোস্ফিয়ার'-এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। এই সংকট থেকে উত্তরণ এবং জীবনের গভীর সংযোগ খোঁজার উপায় নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের পরামর্শ কলাম 'লিডিং কোয়েশ্চেনস'-এ আলোচনা করেছেন পরামর্শক এলিনর গর্ডন-স্মিথ।
চিঠিতে ওই তরুণ নিজের জীবনের এক বেদনাদায়ক চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, শৈশব থেকেই তিনি তীব্র বিষণ্নতা ও উদ্বেগে ভুগছেন এবং তার পারিবারিক পরিবেশও সহায়তাপূর্ণ ছিল না। স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হওয়ায় তিনি নিজেকে সবসময় মূল্যহীন ও অবাঞ্ছিত মনে করতেন, যার ফলে কোনো বন্ধু তৈরি করতে পারেননি। ১৪ বছর বয়স থেকে ঘরেই পড়াশোনা (হোমস্কুলিং) করায় এবং ১৫ বছর বয়স থেকে বেশ কয়েকবার স্থান পরিবর্তনের কারণে তিনি নিজেকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও শিকড়হীন বোধ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কোভিড মহামারির প্রকোপ শুরু হলে তিনি আর ক্যাম্পাসে ফিরতে পারেননি।
ডেটিংয়ের ক্ষেত্রেও তার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তিনি নিজেকে সবসময় 'অনুপযুক্ত' ভাবেন এবং তার মনে হয় তাকে নিখুঁত হতে হবে। নিজেকে কুৎসিত ও সবার চোখে অদৃশ্য মনে করেন তিনি। বর্তমানে নিজের পছন্দের একটি চাকরি করলেও তার মনে সবসময় ভয় কাজ করে যে সহকর্মীরা তাকে গোপনে অপছন্দ করেন। এছাড়া তার বসবাসের শহরটিরও অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবনতি ঘটছে, যা তাকে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত করে তুলেছে। এই মানসিক দোলাচলের মধ্যে কিছুটা নিশ্চয়তা ও আশ্বাসের খোঁজে তিনি 'ম্যানোস্ফিয়ার' বা পুরুষতান্ত্রিক অনলাইন গ্রুপগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হন, যদিও তিনি নিজে এই আদর্শকে ঘৃণা করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, কীভাবে তিনি এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন এবং তার কি কাউকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়া উচিত?
জবাবে এলিনর গর্ডন-স্মিথ ওই তরুণের কষ্টকে পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, এই একাকীত্ব ও মানসিক অবসাদ যেকোনো শারীরিক অসুস্থতার মতোই গুরুতর এবং এর জন্য নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই একাকীত্বে ওই তরুণ একাকী নন; বর্তমান সময়ে বহু মানুষ একই ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
ম্যানোস্ফিয়ারের তীব্র সমালোচনা করে এলিনর বলেন, এই প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষকে বোঝায় যে তাদের কষ্টগুলো একচেটিয়া এবং সমাজ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তারা কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্য ফিরিয়ে আনতে চায়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে একাকীত্ব বা অন্যের কষ্ট দূর করতে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। এটি আসলে কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং এক ধরনের স্বার্থপরতা।
এলিনর পরামর্শ দেন যে, এই দীর্ঘদিনের কষ্ট ও একাকীত্ব ওই তরুণকে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার এক অনন্য ক্ষমতা দিয়েছে। যিনি নিজে একাকীত্বের কষ্ট বোঝেন, তিনি অন্য কোনো অসহায় বা একাকী মানুষকে সহজে বুঝতে ও সাহায্য করতে পারেন। সুন্দর মনের মানুষ হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাকে একটি সহজ জীবন পেতে হবে, বরং প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি অন্যের জন্য কী করতে পারছেন সেটাই আসল। কেউ কেউ সামান্য দুটি মথবল আর এক টুকরো সুতা হাতে পেয়েও নিজের চারপাশটাকে সুন্দর করে তুলতে পারেন।
পরিশেষে তিনি বলেন, ডেটিং অ্যাপ বা অনলাইন দুনিয়ায় বাহ্যিক চেহারা বা চটুল কথাবার্তাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যেখানে ওই তরুণের মতো সংবেদনশীল মানুষের মূল্যায়ন হওয়া কঠিন। তবে গভীর মানবিক সম্পর্কের কাছে এগুলো তুচ্ছ। ওই তরুণকে সবার কাছে আকর্ষণীয় হওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং তার নিজস্ব আগ্রহের জায়গায় নিজের মতো থাকার মাধ্যমেই তিনি এমন জীবনসঙ্গী খুঁজে পাবেন যিনি তাকে তার নিজের সত্তার জন্যই ভালোবাসবেন। নিশ্চয়তা ছাড়াই বাঁচতে শেখা এবং অন্যের জন্য ভালো কিছু করাই জীবনের আসল সার্থকতা।

