মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উভয় পক্ষের আইনপ্রণেতারা যখন শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলগুলো নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাচ্ছেন, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এর তীব্র বিরোধিতা করছেন। তিনি এআই-এর সম্ভাব্য বিপদকে একটি 'ধাপ্পাবাজি' ও 'প্রতারণা' বলে অভিহিত করেছেন এবং দাবি করেছেন যে সরকারের ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রয়েছে। ট্রাম্পের এই অবস্থান তার সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন, টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ এবং এমনকি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোর প্রধানদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তবে এই অবস্থানটি সরাসরি ডেভিড স্যাকসের মতামতের সাথে মিলে যায়, যিনি একজন বিশিষ্ট ধনকুবের ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট এবং ট্রাম্পের সাবেক এআই ও ক্রিপ্টো উপদেষ্টা।
স্যাকস বিশ্বাস করেন যে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বিশ্বব্যাপী এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে ধূলিসাৎ করবে। তাকে ট্রাম্পের 'এআই হুইস্পারার' বা নেপথ্য পরামর্শদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার একাধিক এআই কোম্পানিতে সরাসরি আর্থিক স্বার্থ রয়েছে। সম্প্রতি শতাধিক এআই গবেষক, অধ্যাপক ও প্রযুক্তিবিদ একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করে এআই মডেলগুলোর তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নের দাবি জানান। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন এআই-এর জনক হিসেবে পরিচিত জিওফ্রে হিন্টন এবং প্রখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট রাসেল। স্যাকস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই চিঠিটিকে উড়িয়ে দিয়ে একে 'ছদ্মবিজ্ঞান' এবং 'সেন্সরশিপ ও নিয়ন্ত্রণ' বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, অতীতে কোভিড বা রাশিয়াগেট নিয়ে আতঙ্কের সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো রক্ষণশীলদের কণ্ঠরোধ করতে 'ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি' টিম গঠন করেছিল, যা মানুষের আস্থা হারিয়েছে।
গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প রাজ্যগুলোর এআই নিয়ন্ত্রণ আইন স্থগিত করতে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যা স্যাকসের প্রভাবেরই প্রতিফলন। এই আদেশে গঠিত ফেডারেল টাস্কফোর্সের মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে স্যাকসকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়। এরপর মার্চ মাসে হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের জন্য একটি এআই নীতি প্রকাশ করে, যেখানে রাজ্যগুলোর নিজস্ব নিয়মকে অগ্রাহ্য করার জন্য আইনপ্রণেতাদের উৎসাহিত করা হয়। জুলাই মাসে ট্রাম্প ও স্যাকস ওয়াশিংটনে একটি জমকালো এআই সামিটের আয়োজন করেন। এই সপ্তাহে স্যাকস যখন মঞ্চে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংয়ের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, তখনই ট্রাম্প হুয়াংকে ফোন করে এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করেন। আগামী সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের বৈঠকের কথা রয়েছে, যেখানে ডেভিড স্যাকস এবং বেশ কয়েকজন এআই কোম্পানির প্রধান নির্বাহী উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
অলাভজনক সংস্থা 'ইস্যু ওয়ান'-এর প্রযুক্তি সংস্কার নীতি বিষয়ক প্রধান ইসাবেল সান্ডারল্যান্ড বলেন, স্যাকসের সাথে প্রেসিডেন্টের এই সম্পর্ক দেখায় যে অর্থ কীভাবে ক্ষমতার সরাসরি সংযোগ কিনে নিতে পারে। এটি কেবল এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নয়, বরং কে নিয়মগুলো তৈরি করার সুযোগ পাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিকের একজন কর্মী জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করে দাবি করেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই মানুষের বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদি, ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যান, গুগল ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিস এবং এক্সএআই-এর ইলন মাস্ক প্রযুক্তিটির গতি কিছুটা ধীর করার প্রস্তাব সমর্থন করেন। তবে স্যাকস এই প্রস্তাবকে 'নির্বাচনী মৌসুমের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ' বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন যে কারো যদি নিজস্ব মডেল নিয়ে ভয় থাকে তবে তারা নিজেরাই যেন কাজ ধীর করে দেয়, এর জন্য অন্যের অনুমতির প্রয়োজন নেই।
স্যাকসের জন্ম ১৯৭২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি পড়ার সময় তার পরিচয় হয় পিটার থিলের সাথে। পরবর্তীতে তারা দুজনে মিলে ১৯৯৫ সালে 'দ্য ডাইভারসিটি মিথ' নামক একটি বই লেখেন, যেখানে বহুসংস্কৃতিবাদ ও রাজনৈতিক সচেতনতার সমালোচনা করা হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে তারা ইলন মাস্কসহ অন্যদের সাথে পেপ্যাল-এ কাজ শুরু করেন, যা পরবর্তীতে 'পেপ্যাল মাফিয়া' নামে পরিচিতি পায়। ২০১৭ সালে স্যাকস 'ক্রাফট ভেঞ্চারস' প্রতিষ্ঠা করেন, যার অধীনে ২০২৩ সাল নাগাদ ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রয়েছে। এই ফার্মটি স্পেসএক্স, প্যালান্টিয়ার, মেটা, এয়ারবিএনবি, লিফট এবং বেশ কয়েকটি এআই স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেছে।
২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনকে অনুদান দিলেও স্যাকস দ্রুত রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি জেডি ভ্যান্স, রন ডিস্যান্টিস এবং রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রকে অনুদান দিয়েছেন। ২০২৪ সালের জুনে তিনি ট্রাম্পের জন্য সান ফ্রান্সিসকোর তার ৪৫ মিলিয়ন ডলারের প্রাসাদে একটি তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, যেখানে প্রতি দম্পতির জন্য টিকেটের মূল্য ছিল ৫ লাখ ডলার। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর স্যাকসকে এআই ও ক্রিপ্টো উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। বিশেষ সরকারি কর্মচারী হিসেবে বছরে সর্বোচ্চ ১৩০ দিন কাজ করার সুযোগ থাকায় তাকে কোনো আর্থিক ঘোষণা দিতে হয়নি, তবে ক্রাফট ভেঞ্চারসকে কিছু এআই শেয়ার বিক্রি করতে হয়েছিল। মার্চ মাসে তিনি পদ ছাড়লেও ট্রাম্পের ওপর তার প্রভাব বজায় থাকে।
ট্রাম্পের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হারমিত ধিলোন এবং প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা যেমন স্কট বেসেন্ট ও সুজি ওয়াইলস এআই তদারকি বাড়ানোর পরামর্শ দিলেও ট্রাম্প স্যাকসের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। অথচ ফিউচার অব লাইফ ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থক এআই সুরক্ষায় ট্রাম্পের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে। টেক ওভারসাইট প্রজেক্টের নির্বাহী পরিচালক সাশা হাওয়ার্থ স্যাকসকে 'বাস্তববিমুখ সিলিকন ভ্যালি চরমপন্থী' বলে সমালোচনা করেছেন, যিনি মানুষকে যন্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চান। এ বিষয়ে স্যাকস এবং হোয়াইট হাউসের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

