৯৭ বছর বয়সে প্রয়াত জাপানি শিল্পী ইয়ায়োই কুসামা কেবল তাঁর বর্ণাঢ্য শিল্পকর্মের জন্যই পরিচিত ছিলেন না, বরং মানসিক স্বাস্থ্য ও নিউরোডাইভারজেন্সের সঙ্গে তাঁর লড়াইও ছিল তাঁর সৃজনশীলতার মূল উৎস। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই তিনি বিভিন্ন দৃশ্য ও শব্দগত হ্যালুসিনেশনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন, যা তিনি ‘আলোর ঝলকানি’, ‘আউরা’ বা ‘নিবিড় বিন্দুর ক্ষেত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে আঁকা তাঁর মায়ের একটি ছবিতে বিন্দুর মাধ্যমে অবয়ব ঢেকে দেওয়ার চিত্রটিই পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
নিজের এই হ্যালুসিনেশন সম্পর্কে কুসামা বলেছিলেন, টেবিলক্লথের লাল ফুলের নকশা যখন তিনি দেয়াল, জানালা এবং নিজের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে দেখতেন, তখন তিনি নিজেকে এক অসীম শূন্যতায় হারিয়ে যেতে অনুভব করতেন। শিল্পকলাকেই তিনি বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। ২০১২ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, প্রতিদিনের উদ্বেগ, ভয় ও যন্ত্রণার বিরুদ্ধে লড়াই করার একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে তিনি শিল্পকে আঁকড়ে ধরেছিলেন।
কুসামার এই পথচলা তাঁকে নিউ ইয়র্কের আভঁ-গার্দ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ এবং পপ আর্টের প্রভাবশালী শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। লন্ডনের টেট মডার্নে তাঁর ‘ইনফিনিটি মিরর রুমস’ প্রদর্শনীটি দর্শকদের ব্যাপক চাহিদার কারণে ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা হয়েছিল।
আজকের পৃথিবী মানসিক স্বাস্থ্য ও নিউরোডাইভারজেন্স সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। এনেনা কালুর মতো নিউরোডাইভারজেন্ট ও প্রতিবন্ধী শিল্পীরা এখন টার্নার প্রাইজ জয়ের মতো বড় স্বীকৃতি পাচ্ছেন। অ্যাকশনস্পেসের মুখপাত্রের মতে, কুসামার মতো শিল্পীরা প্রমাণ করেছেন যে মহান শিল্প কোনো নির্দিষ্ট প্রথাগত পথ অনুসরণ করে তৈরি হয় না।
কুসামা তাঁর জীবনের সংগ্রাম নিয়ে বরাবরই ছিলেন অকপট। সত্তরের দশকে তিনি স্বেচ্ছায় টোকিওতে একটি মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে কাছেই একটি স্টুডিওতে কাজ চালিয়ে যান। তাঁর বিখ্যাত ‘ইনফিনিটি রুমস’ বা দর্পণ ও আলোর স্থাপনাগুলো মূলত তাঁরই দেখা এক প্রবল তীব্র ও প্যাটার্নময় জগতের বহিঃপ্রকাশ। প্রজেক্ট আর্ট ওয়ার্কসের পরিচালক কেট অ্যাডামস জানান, কুসামার এই কাজগুলো কেবল মানসিক জটিলতার বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং তা অন্যদের জন্য এক জাদুকরী ও গভীর উপলব্ধির জগত তৈরি করেছিল।
নিউরোডাইভারজেন্ট শিল্পীদের কাজের ক্ষেত্রে যে উদ্দীপনা ও সংবেদনশীলতা দেখা যায়, কুসামার শিল্পকর্মের সঙ্গে তার গভীর যোগসূত্র রয়েছে। এই সচেতনতা আজ স্কুল, হোটেল ও বিমানবন্দরের মতো বিভিন্ন স্থানে সেন্সরি রুম তৈরির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। কুসামার এই যাত্রা কেবল শিল্পীদের জন্যই নয়, বরং মানুষের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

