অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে মাঠে নামার ঠিক আগে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব হারিয়েছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) মনে করেছিল, নেতৃত্বের অতিরিক্ত চাপে তার পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ছে, তাই তাকে কেবল খেলায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দিতে লিটন কুমার দাসের হাতে তুলে দেওয়া হয় ওয়ানডে দলের দায়িত্ব। তবে প্রস্তুতি ম্যাচে সেঞ্চুরি এবং চলমান টেস্টে মিরাজের অনবদ্য পারফরম্যান্স প্রমাণ করছে, অধিনায়কত্ব হারানোর মানসিক ধাক্কা তাকে এতটুকুও দমাতে পারেনি। বরং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশকে এক ঐতিহাসিক জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এই অলরাউন্ডার।
ওয়ানডে অধিনায়কত্ব হারানোর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজেকে প্রমাণ করার কোনো তাগিদ অনুভব করছেন কি না, এমন প্রশ্নে বেশ সতর্কতার সঙ্গে উত্তর দিয়েছেন মিরাজ। তিনি বলেন, 'আমার মনে হয় এমনটা (অধিনায়কত্ব হারানো) হতেই পারে এবং এই মুহূর্তে আমার মানসিকতা একদম পরিষ্কার। আমি জানি কীভাবে সঠিক জায়গায় বল করতে হয় এবং কীভাবে ব্যাটিং করতে হয়।'
দ্বিতীয় দিনে তানজিদ হাসান তামিম (যিনি সেঞ্চুরি করেছিলেন), লিটন কুমার দাস ও মুশফিকুর রহিমের উইকেট দ্রুত হারিয়ে যখন বাংলাদেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল, তখন হাল ধরেন মিরাজ। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর দুর্দান্ত ৮৪ রান এবং তানজিদের ইনিংসের ওপর ভর করে বাংলাদেশ বড় সংগ্রহের ভিত পেলেও স্বাগতিকদের দ্বিতীয় নতুন বলের তোপে তা দ্রুত বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে বড় জুটি গড়ার সময় পাননি মিরাজ, তবে লেজের সারির ব্যাটসম্যানদের নিয়ে তিনি যে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তা সফরকারীদের চালকের আসনে বসিয়ে দেয়। দ্বিতীয় দিনে হাসান মাহমুদকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করা উদ্ধারকাজ তিনি টেনে নেন তৃতীয় দিনের প্রথম সেশন পর্যন্ত।
বাংলাদেশ তৃতীয় দিন শুরু করেছিল ৬ উইকেটে ৩৫১ রান নিয়ে। দিনের শুরুতেই হাসান মাহমুদকে হারায় দল। এরপর তাইজুল ইসলাম ২৩ বলে একটি চার ও একটি ছক্কার সাহায্যে দ্রুত ১৭ রান করে জশ হ্যাজলউডের বলে গালিতে ক্যামেরন গ্রিনের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। তবে মিরাজ অজি বোলারদের হতাশ করে ১১৭ বলে নিজের ১০ম টেস্ট হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন। শেষ পর্যন্ত ১৫৪ বলে ৬৫ রান করে আউট হওয়ার আগে তিনি উইকেটে রীতিমতো লড়াই করেছেন। দ্বিতীয় দিনে প্রায় দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ৭৩ বল মোকাবিলা করা মিরাজ তৃতীয় দিনে ১২৪ মিনিট ক্রিজে থেকে ৮৩ বল খেলেন এবং অজি বোলারদের ক্লান্ত করে তোলেন।
লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদের নিয়ে নিখুঁতভাবে ইনিংস টেনে নিয়ে যান মিরাজ। হাসান মাহমুদ ও তাসকিন আহমেদের সঙ্গে দুটি মূল্যবান ৪৬ রানের জুটি গড়েন তিনি। হাসানের সঙ্গে জুটিতে মিরাজ নিজে করেন ৩২ রান এবং তাসকিনের সঙ্গে নবম উইকেটের জুটিতে অবদান রাখেন ৩০ রান। ব্যাটিংয়ের সময় মিরাজ নিজের ওপর সব চাপ নেননি, বরং সতিনি সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন। মিরাজ বলেন, 'সবাই খুব ভালো ক্রিকেট খেলছে এবং একে অপরের দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছে। এটা দেখতে খুব ভালো লাগে। লোয়ার অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা দারুণ ব্যাটিং করেছে। আসলে আমার জন্য ব্যাটিং করা কিছুটা কঠিন ছিল, কারণ আমি যখন মাঠে আসি তখন মুশফিক ভাই আউট হয়ে গেছেন। তাই বোলারদের সঙ্গে নিয়েই আমাকে রান করতে হতো এবং ওই পরিস্থিতিতে রান তোলাটা আমার জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল।'
ব্যাটিংয়ের পর বল হাতেও মিরাজ ছিলেন দুর্দান্ত। প্রথম ইনিংসে ৭১ রান করা স্টিভেন স্মিথ যখন দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৪ রান করে আবারও বড় স্কোরের দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন তাকে সাজঘরে ফেরান মিরাজ। স্মিথকে নিজের বলে ফিরতি ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন তিনি। গতির তারতম্য ঘটিয়ে স্মিথের মনোযোগ নষ্ট করার পরিকল্পনা সফল হয়েছে বলে জানান এই অফস্পিনার। স্মিথকে আউট করার পরিকল্পনা নিয়ে মিরাজ বলেন, 'আমরা শুধু সঠিক জায়গায় বল করার দিকে মনোযোগ দিয়েছিলাম। আমি জানতাম স্মিথকে বেশি রান করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। ও দারুণ খেলোয়াড় এবং ভালো ফর্মে আছে, কিন্তু আমরা যদি রান আটকে রাখতে পারি তবে উইকেট পাব—এটাই ছিল আমাদের ভাবনা। আমি আমার পরিকল্পনা সহজ রেখেছিলাম, রান করার সুযোগ কমিয়ে দিয়ে সব সময় ভালো জায়গায় বল করার চেষ্টা করেছি এবং লাইন ও লেংথ পরিবর্তন করেছি।'
স্মিথের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ইনিংস ব্যবধানে জয়ের গুঞ্জন শুরু হলেও মিরাজ এখনই এত দূরে তাকাতে রাজি নন। তিনি বলেন, 'দেখুন, উইকেট এখনও বেশ ভালো অবস্থায় আছে। আমরা এখনই ইনিংস ব্যবধানে জয়ের মতো কিছু ভাবছি না। আমরা শুধু ভালো জায়গায় বল করার চেষ্টা করছি। প্রতিটি উইকেট নিতে আমাদের অনেক খাটতে হচ্ছে। উইকেট এত সহজ নয়, আমরা যে উইকেটগুলো পেয়েছি তা অনেক কষ্ট করে নিতে হয়েছে। তাই আমরা যতটা সম্ভব রান আটকে রাখার চেষ্টা করছি।' তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা যত কম রান দেব, আমাদের জন্য তত ভালো। খেলায় এখনও দুই দিন বাকি আছে। এখান থেকে আরও তিনটি উইকেট নেওয়া আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওদের সবাই ভালো ব্যাটিং করতে পারে এবং দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উইকেট আরও ভালো হচ্ছে। তাই আমরা অনেক বড় লক্ষ্য নিয়ে না ভেবে ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।'

