ঐতিহাসিকভাবে চিত্রকলার বিশ্লেষণে প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক জন বার্জার একবার মন্তব্য করেছিলেন, সমাজ পুরুষকে দেখে কাজের ধারক হিসেবে আর নারীকে দেখে প্রদর্শনের বস্তু হিসেবে। ঐতিহ্যগতভাবে ছবি বা চিত্রশিল্পে পুরুষদের মূলত তাদের শারীরিক শক্তি, ক্ষমতার প্রকাশ এবং আধিপত্য প্রমাণের মাধ্যম হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হতো। তবে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম চতুর্থাংশ পার করে এসে আলোকচিত্রের চোখ দিয়ে পুরুষত্বকে যেভাবে ক্যামেরাবন্দী করা হয়েছে, তা বহু পুরোনো সামাজিক ধারণা ও পুরুষালী ক্ষমতার ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে। ‘ব্ল্যাক ব্যাগ’ গ্রন্থের লেখক লুক কেনার্ডের মতে, পুরুষত্ব কোনো স্থির সত্য নয়; এটি ইতিহাস, বিপরীত-ইতিহাস এবং সামাজিক সংস্কারের ভারী এক বোঝা, যার মুখোমুখি প্রতিটি পুরুষকে ভিন্ন ভিন্নভাবে দাঁড়াতে হয়।
বডি বিল্ডিংয়ের স্বর্ণযুগ থেকে শুরু করে খেলার মাঠের কান্না, কিংবা সমকামী সংস্কৃতি থেকে শুরু করে ফ্যাশনের ভিন্নধর্মী প্রকাশ— আলোকচিত্র কীভাবে সমাজমানসে পুরুষের রূপকে বদলে দিয়েছে, তার বিস্তারিত উদাহরণ দেখা যায় ইতিহাস সৃষ্টিকারী ৩৯টি বিশেষ আলোকচিত্রে। ১৯৭৬ সালে বিখ্যাত আলোকচিত্রি রবার্ট ম্যাপলথর্প তৎকালীন বডি বিল্ডার আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের একটি প্রতিকৃতি তোলেন। ‘পাম্পিং আয়রন’ প্রামাণ্যচিত্র মুক্তির ঠিক এক বছর আগে তোলা এই ছবিতে শোয়ার্জনেগার অতি-পুরুষালী শরীর আর একধরনের আত্মবিশ্বাসী মেজাজের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে ‘গে টাইমস’ সাময়িকী লিখেছিল, তিনি অতি-ক্ষমতাশালী হিসেবে নিজেকে জাহির করেননি, বরং এক ধরনের উজ্জ্বল ও শান্ত মেজাজ ছড়িয়ে দিয়েছেন। গে পুরুষদের প্রশংসা ও আকর্ষণকে তিনি বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ না হয়ে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছিলেন।
চলচ্চিত্র জগতে পুরুষের শারীরিক রূপকে যৌনতার বস্তুতে রূপান্তরের সূচনা করেছিলেন মার্লন ব্র্যান্ডো। ১৯৮৫ সালে লেখক গোর ভিদাল লিখেছিলেন, ১৯৪৭ সালে ‘এ স্ট্রিটকার নেমড ডিজায়ার’ নাটকে যখন ব্র্যান্ডো একটি ছেঁড়া, ঘামে ভেজা টি-শার্ট পরে মঞ্চে হাজির হন, তখন মনে হয়েছিল যেন একটা ভূমিকম্প ঘটে গেছে। এর আগে হলিউডের নায়করা ছিলেন কেবল পোশাকে মোড়ানো কিছু চরিত্র; ব্র্যান্ডোই প্রথম প্রমাণ করেন পুরুষও আকর্ষণীয় যৌন প্রতীক হতে পারেন। অন্যদিকে, পোশাক ও চালচলনে ভিন্ন ধারার পুরুষত্ব প্রদর্শন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন অস্কার ওয়াইল্ড। ১৮৮২ সালে আমেরিকা বক্তৃতা সফরে ২৭ বছর বয়সী অস্কার ওয়াইল্ডের তোলা একটি ছবি তৎকালীন অভিজাত সমাজকে যেমন চমত্কৃত করেছিল, তেমনই সমালোচনার মুখেও ফেলেছিল। পরবর্তীতে পুরুষদের সাথে সমকামী সম্পর্কের অভিযোগে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়, এবং পত্রিকাগুলো তার সেই ছবিতে ফুটে ওঠা ‘নারীসুলভ’ ভঙ্গিমার তীব্র সমালোচনা করে।
হলিউডের প্রথমদিকের হার্টথ্রব বা রোমান্টিক নায়কদের একজন ছিলেন জাপানি বংশোদ্ভূত অভিনেতা সেসু হায়াকাওয়া। ১৯১৫ সালে সেসিল বি ডেমিলের ‘দ্য চিট’ চলচ্চিত্রে ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া তারকাদের একজন হয়ে ওঠেন। একটি প্রিমিয়ারে তার আসার পর ভক্ত নারী ভক্তরা কাদায় যাতে পা না পড়ে, সে জন্য তাদের দামী পশমি কোট রাস্তায় বিছিয়ে দিয়েছিলেন। তবে এশীয় হওয়ার কারণে তাকে নানা বর্ণবাদী টাইপকাস্টিংয়ের শিকার হতে হয় এবং তখনকার আইনে আন্তঃবর্ণ বিয়ের চিত্রায়ন নিষিদ্ধ থাকায় পর্দায় তিনি কখনো প্রেমিকার ভালোবাসা পাননি। পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’ ছবিতে স্বৈরাচারী কর্নেল সাইতো চরিত্রে অভিনয় করে তিনি অস্কার মনোনয়ন পেয়ে পুনর্জন্ম পান।
সুদানের কর্ডোফান অঞ্চলের নুবা পর্বত এলাকার কুস্তিগীরদের আলোকচিত্র বৈশ্বিক অঙ্গনে ভিন্ন বিতর্ক তৈরি করেছিল। ম্যাগনামের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জর্জ রজার একজন কুস্তিগীরকে সমর্থকের কাঁধে চেপে থাকার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রাক্তন নাৎসি আলোকচিত্রি লেনি রিফেনস্টাল সেখানে গিয়ে বিতর্কিত ও বহিরাগত নজরে কাজ করায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হন। সুদানীয় অধ্যাপক গুমা কুন্দা কোমে জানান, সেখানকার মানুষ নিজেদের শোষিত মনে করেছিলেন। অন্যদিকে, পারিবারিক সহিংসতার নির্মম সত্য ফুটিয়ে তুলেছিলেন ছবি সাংবাদিক ডোনা ফেরাতো। ১৯৯১ সালের ‘লিভিং উইথ দ্য এনিমি’ বইয়ে স্থান পাওয়া মিনিয়াপোলিসের একটি ছবিতে আট বছরের শিশু ডায়মন্ডকে তার বাবার দিকে চিৎকার করে বলতে দেখা যায়— “আমার মাকে মারার জন্য আমি তোমাকে ঘৃণা করি।” ডোনা ফেরাতো স্মরণ করেন, শিশুটি নিজেই পুলিশ ডেকেছিল এবং ঘরের কোথায় তার বাবা স্ক্রু-ড্রাইভার লুকিয়ে রেখেছিল, তা বের করে দিয়েছিল।
মার্কিন রাজনীতিকদের ভাবমূর্তিতে পুরুষত্বের ভূমিকা ছিল সুদূরপ্রসারী। তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল থিওডোর ‘টেডি’ রoseveltকে ঘোড়ায় চড়া অবস্থায় ক্যামেরাবন্দী করা হয়, যাকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম ‘পুরুষালী প্রেসিডেন্ট’ বলা হতো। ধনী পরিবারে বেড়ে উঠলেও তিনি শ্রমিকদের মতো পোশাকে ছবি তুলতে ভালোবাসতেন, যাতে শৈশবের শারীরিক দুর্বলতার কোনো ছাপ না থাকে। আবার ১৯৫৮ সালে লাইফ ম্যাগাজিনের এড বার্কের তোলা ছবিতে দেখা যায়, সিনেটর জন এফ কেনেডি তার শিশু কন্যা ক্যারোলাইনের সাথে খেলছেন। কেনেডির স্ত্রী জ্যাকি পরে সেই ছবির ৭৫টি কপি বন্ধুদের দেওয়ার জন্য চেয়ে নিয়েছিলেন এবং ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ছবিটি হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যা তার তরুণ ও উদ্যমী পারিবারিক ভাবমূর্তিকে জোরদার করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনীর বিমান প্রচারণার অংশ হিসেবে আলোকচিত্রি হোরাস ব্রিস্টল প্রশান্ত মহাসাগরের রাবাউল উপসাগরে গুলিবিদ্ধ এক মেরিন পাইলটকে উদ্ধারের দৃশ্য ধারণ করেন। বিমানে থাকা এক উদ্ধারকারী সৈনিক নিজের সমস্ত পোশাক খুলে সাগরে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, কারণ বুট ও পোশাক পরে সাঁতার কাটা অসম্ভব ছিল। উদ্ধার শেষে খালি গায়ে গ্যানারে বসে থাকা সেই অজ্ঞাত সৈনিকের ছবি তৎকালীন সময়ে পুরুষালী বীরত্ব ও সাহসিকতার আইকন হয়ে ওঠে। ফ্যাশন ও পারফর্মেন্স আর্টের দুনিয়ায় প্রচলিত ধারণাকে চুরমার করে দিয়েছিলেন লেই বাওয়ারি। আশির দশকের এই পারফর্মিং আর্টিস্ট এমন সব পোশাক পরতেন, যা পুরুষের বাহ্যিক অবয়ব নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী লুসিয়ান ফ্রয়েড তার পারফর্মেন্স দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকে নিজের ছবির মডেল হওয়ার অনুরোধ জানান।
ওয়েলসের প্রাক্তন কয়লা খনি শ্রমিক আড্রিয়ান স্ট্রিট পেশাদার কুস্তির জগতে এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেন। ‘দ্য স্যাডিস্ট ইন সেকুইনস’ বা ‘কুইন বিচ অব প্রফেশনাল রেসলিং’ নামে পরিচিত এই কুস্তিগীর ১৯৭৪ সালে নিজের বাবা— যিনি তার এই ক্যারিয়ার পছন্দ করতেন না— তার সাথে খনির নিচে একটি আলোচিত ছবি তোলেন। ভারী মেকআপ ও অভিনব পোশাক পরা সত্ত্বেও শিল্পী জেরোমি ডেলারের মতে, সেই লুকের মাধ্যমে তিনি পুরো সমাজ ও ব্যবস্থার সামনে এক ধরণের সাহসী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। একইভাবে, ১৯৫৪ সালে উইলিয়াম ক্লাইনের তোলা ছবিতে একটি ছোট ছেলেকে ক্যামেরার দিকে পিস্তল উঁচিয়ে শক্ত ভঙ্গি করতে দেখা যায়। একে ক্লাইন তার নিজের বাল্যকালের একটি রূপক বা ডাবল সেলফ-পোর্ট্রেট বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে রাস্তার দুষ্টু ছেলে ও ভীতু ভালো ছেলের দ্বৈত রূপ প্রকাশ পায়।
জনসমক্ষে পুরুষের আবেগের প্রকাশের অন্যতম ঐতিহাসিক দলিল হলো ১৯৪১ সালের লাইফ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত জেরোম বারজেত্তির কান্নার ছবি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের পতনের পর সেনা পতাকা আফ্রিকার নিরাপদ স্থানে পাঠানোর সময় মার্সেইয়ের রাস্তায় শোভাযাত্রা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বারজেত্তি। তবে প্রাচীন হোমারীয় মহাকাব্য ‘ওডিসি’-তেই পুরুষদের ৩০টিরও বেশি স্থানে কাঁদতে দেখা যায়। ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান আধুনিক পুরুষরা তাদের বাবাদের তুলনায় জনসমক্ষে দ্বিগুণ বেশি কাঁদেন। অন্যদিকে, আধুনিক বডি বিল্ডিংয়ের জনক ইউজেন স্যান্ডো ১৮৯০-এর দশকে নিজের পেশীবহুল শরীর প্রদর্শন করে গ্রীক ভাস্কর্যের মতো আদর্শ পুরুষ শরীরের মাপকাঠি দাঁড় করিয়েছিলেন। ১৯০১ সালে লন্ডনে প্রথম শারীরিক গঠন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা এই অ্যাথলেটের হাত ধরেই আজকের ফিটনেস সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি হয়।
বর্ণবাদ ও কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষের অদৃশ্যতার বিরুদ্ধে আলোকচিত্রকে হাতিয়ার করেছিলেন র্যালফ এলিসন ও গর্ডন পার্কস। এলিসনের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইনভিজিবল ম্যান’-এর ওপর ভিত্তি করে লাইফ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ছবিটিতে অভিনেতা জন বেটসকে ম্যানহোল থেকে উঠে আসতে দেখা যায়, যা সমাজে নিজের অবস্থান ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতীক। আবার সমকামী পুরুষদের আবেগ ও ভালোবাসাকে প্রকাশ্যে আনার সাহসিকতা দেখান আলোকচিত্রি উলফগ্যাং টিলম্যানস। লন্ডনের গে ক্লাব ‘দ্য কক’-এ দুটি পুরুষের আবেগঘন চুম্বনের ছবি ২০০৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রদর্শিত হলে একজন দর্শনার্থী চাবি দিয়ে ছবিটি কেটে নষ্ট করে দেন। পরে ২০১৬ সালে অরল্যান্ডোর পালস নাইটক্লাবে হামলার পর এই ছবিটি বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ ও সংহতির প্রতীক হয়ে ওঠে।
সন্তান লালন-পালনে বাবার ভূমিকা এবং সাধারণ জীবনযাপনে পপ আইকন ডেভিড বোউই নতুন ধারা আনেন। স্ত্রী অ্যাঞ্জির সাথে নিজের শিশু জাওইকে লাল রঙের ট্রলিতে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার ছবি তখনকার সমাজে পারিবারিক পুরুষত্বের বার্তা দিয়েছিল, যদিও ১৯৭৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে বোউই বলেছিলেন তিনি নিজেকে খুব একটা পিতৃত্বসুলভ মনে করেন না। নৃত্যশিল্পে নমনীয়তার ধারণায় কলম্বিয়ান ব্যালে নৃত্যশিল্পী হুয়ান পাবলো রদ্রিগেজের প্রতিকৃতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার ১৯৫৩ সালে মায়ের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে প্লেবয় পত্রিকা শুরু করা হিউ হেফনার এমন এক পুরুষালী ফ্যান্টাসি তৈরি করেছিলেন, যেখানে নারী ও বিলাসিতাকে ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে প্রখ্যাত নাইজেরীয় আলোকচিত্রি রটিমি ফানি-কায়োদে কৃষ্ণাঙ্গ ও সমকামী পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেন, যা আশির দশকে এইডস মহামারীর চরম সময়ে কৃষ্ণাঙ্গদের সহিংস বা অপরাধী ভাবমূর্তির চেনা ছক ভেঙে দেয়।
স্পোর্টস ও বিনোদনের জগতে ১৯৮৭ সালের ওয়ার্ল্ডরেসলিং ফেডারেশনের ‘রেসলম্যানিয়া ৩’-এ হাল্ক হোগান ও ৫২০ পাউন্ড ওজনের অ্যান্ড্রে দ্য জায়ান্টের লড়াই পুরুষালী বিনোদনের চরম প্রকাশ ঘটায়। অন্যদিকে, আলোকচিত্রি মার্টিন পার সাধারণ ফুটবল সমর্থকদের আবেগ ধরে রাখতে ২০১২ সালে উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্স দলের গোল করার পর গ্যালারির উন্মাদনার ছবি তোলেন। পার মনে করেন, ফুটবল ক্লাব সমর্থন করা পুরুষদের আবেগ প্রকাশের একটি বড় জায়গা, যদিও এর উল্টো পিঠে বর্ণবাদ, সমকামবিদ্বেষ ও পারিবারিক সহিংসতার মতো অন্ধকার দিকও রয়েছে। ২০১৯ সালের অস্কারের লাল গালিচায় অভিনেতা বিলি পোর্টারের পরা খ্রিস্টান সিস্ত্রিয়ানোর তৈরি টাক্সিডো ড্রেস ফ্যাশন দুনিয়ায় আলোড়ন তোলে। বিলি পোর্টার স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “আমি ড্র্যাগ কুইন নই, আমি পোশাক পরা একজন পুরুষ।” তার এই পরাবাস্তব পোশাক পরবর্তীতে ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হয়।
রাস্তায় নারীদের উত্যক্তকারীদের বিরুদ্ধে লরি অ্যান্ডারসন ১৯৭৩ সালে ‘ফুলি অটোমেটেড নিকন’ সিরিজের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। রাস্তায় মন্তব্য করা পুরুষদের ছবি তুলে তাদের চোখের ওপর সাদা পট্টি বসিয়ে দিয়ে তিনি পুরুষদের নজরদারি করার ক্ষমতাকে প্রতীকীভাবে কেড়ে নেন। মরক্কো-ব্রিটিশ আলোকচিত্রি হাসান হাজ্জাজ তার ‘মাই লন্ডন রকস্টারস’ সিরিজে লন্ডনের স্কেটবোর্ডিং ও আর্ট গ্রুপ ‘আওয়ার মাদারল্যান্ড কালেক্টিভ’-এর বহুসাংস্কৃতিক তরুণদের রঙবেরঙের পোশাকে তুলে ধরেন। একইভাবে, ভারতীয় আলোকচিত্রি সুনীল গুপ্ত ১৯৮৬-৮৭ সালে দিল্লিতে ‘এক্সাইলস’ সিরিজের মাধ্যমে সমকামী পুরুষদের ছবি তুলে শিল্প ইতিহাসে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন, এমন এক সময়ে যখন ভারতে সমকামিতা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো।
১৯৮৬ সালে অ্যাথেনা পোস্টার রিটেইলারের বিজ্ঞাপনী পোস্টারে স্পেন্সার রোয়েলের তোলা একটি ছবি বিশ্বজুড়ে বহুল বিক্রিত পোস্টারে পরিণত হয়, যেখানে একজন পেশীবহুল পুরুষকে একটি শিশুকে কোলে নিয়ে বুক আগলে রাখতে দেখা যায়। এটি আশির দশকের ‘নিউ ম্যান’ বা সহানুভূতিশীল পুরুষের আদর্শ তুলে ধরে। ১৯৭০ সালে ক্রেমার সাচি সংস্থার তৈরি একটি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনে একজন গর্ভবতী পুরুষের ছবি একে পুরুষদের যৌন দায়িত্বশীলতার বার্তা দেওয়া হয়েছিল। কঙ্গোর রাজধানী ব্রাজভিল ও কিনশাসার পোশাক সচেতন দল ‘সাপারস’ (Sapeurs)-দের জীবন নিয়ে আলোকচিত্রি জাস্টিন মাকাঙ্গারা জানান, তারা সংঘাতের মধ্যেও পোশাক ও ফ্যাশনের মাধ্যমে শান্তি ও আনন্দ প্রকাশ করেন।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহামের জ্যা পল গতিয়ের সারং বা ঘাগড়া পেঁচানো পোশাক পরা নিয়ে সান পত্রিকা শিরোনাম করেছিল “বেকহামের গায়ে পশ ড্রেস”। বেকহাম পরবর্তীতেও তার সেই ফ্যাশনকে সমর্থন করেন, যা তাকে ২০০০-এর দশকের ‘মেট্রোসেক্সুয়াল’ ধারার আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। আবার ২০০১ সালে তালেবান শাসনের পতনের পর আলোকচিত্রি থমাস ডোরজাক কান্দাহারের একটি ফটো স্টুডিও থেকে তালিবান যোদ্ধাদের গোপন মেকআপ করা, ফুল ও পিস্তল হাতে নেওয়া রঙিন ছবি উদ্ধার করেন, যা তালেবানদের কঠোর ভাবমূর্তির সম্পূর্ণ বিপরীত এক দৃশ্য তৈরি করে। ২০১৮ সালে বিখ্যাত অভিনেতা ড্যানিয়েল ক্রেইগ বুকে বাচ্চা বাঁধার ক্যারিয়ার ঝুলিয়ে হাঁটার পর উপস্থাপক পিয়ার্স মরগান ‘#emasculatedBond’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে উপহাস করলে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার বাবা নিজেদের সন্তানদের কোলে নেওয়া ছবি পোস্ট করে তার জবাব দেন।
উপসংহারে, ১৯৬৪ সালের ব্রাইটনে ঐতিহ্যবাহী ‘মডস’ ও ‘রকার্স’ তরুণদের মারামারির ছবি থেকে শুরু করে ১৯৬০-এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার মোটরবাইক গ্যাং ‘হেলস অ্যাঞ্জেলস’-এর পুরুষালী উন্মাদনা, কিংবা ক্যাথরিন ওপির হাইস্কুল ফুটবল খেলোয়াড়দের ছবি— সবই প্রমাণ করে যে পুরুষত্ব কোনো একক সংজ্ঞায় আবদ্ধ নয়। ১৯৬৮ সালে গ্লাসগোর গর্বালস জেলার পাব-এ শুধুমাত্র পুরুষদের সমাগমের যে ছবি জার্মান বংশোদ্ভূত আলোকচিত্রি জুর্গেন শেডেবার্গ তুলেছিলেন, সেখান থেকে ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে হলুদ কার্ড পেয়ে পল গ্যাসকোইনের (গাজ্জা) কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য— আলোকচিত্রের দীর্ঘ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে পুরুষত্ব একটি পরিবর্তনশীল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।

