ইসরায়েলে হামাসের হামলার তিন বছর পূর্তিতে বুধবার দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে স্মারক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর এই হামলার মাধ্যমেই গাজায় বর্তমান যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, যাতে প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। শোকাতুর পরিবারগুলো সেই সব স্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন যেখানে এই ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছিল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে জানান, এই দিনে পুরো জাতি তাদের হারানো স্বজনদের জন্য শোক প্রকাশ করছে। তিনি হামলায় নিহতদের স্মরণে মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের মিশন সম্পন্ন করব: আমরা হিসাব চুকিয়েছি এবং সব খুনির সাথে হিসাব চুকানো অব্যাহত রাখব। সোমবার ইহুদি ক্যালেন্ডারের বার্ষিকীতে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল সেই দিনে গাজা থেকে অনুপ্রবেশকারী ৬,০০০ ফিলিস্তিনির মধ্যে ৪,০০০ জনকে হত্যা করেছে। তবে এই হামলার নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। তিনি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা অস্বীকার করেছেন এবং সুপ্রিম কোর্ট পরিচালিত তদন্তের বিরোধিতা করে আসছেন।
দক্ষিণ ইসরায়েলের নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যাল সাইটে আয়োজিত স্মরণসভায় শোকাতুর পরিবার ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা একত্রিত হন। ওই উৎসবে ৩৭৮ জন নিহত হয়েছিলেন এবং ৪৪ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে ২৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আহুভা ইয়াভিন মেইজ, যার ২১ বছর বয়সী মেয়ে আদি উৎসবে নিহত হয়েছেন, তিনি এই ঘটনাকে ‘ডিস্টোপিক ও অকল্পনীয়’ বলে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া কিবুতজ কাফার আজা এবং অন্যান্য স্থানেও নিহতের স্মরণে বিশেষ আয়োজন ছিল। কিবুতজ কাফার আজার কমিউনিটি লিডার জিয়ন রেগেভ জানান, অধিকাংশ বাসিন্দা এখনও ট্রমার কারণে নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেননি।
তেল আবিবের ডিজেনগফ স্কোয়ারে বিক্ষোভকারীরা ঝরনার পানি লাল রঙে রঞ্জিত করে প্রতিবাদ জানান। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ করে তারা নীরবতা পালন করেন। বিক্ষোভকারীদের ব্যানারে নেতানিয়াহুকে ‘দোষী’ এবং সরকারের ব্যর্থতাকে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনভ জাঙ্গাউকার, যার ছেলে মাতান জিম্মি ছিলেন এবং পরে মুক্তি পান, তিনি সরকারের সমালোচনা করে সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
গাজায় পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে অন্তত ৭৪,২০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গাজার ৮০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং প্রায় ১২ লাখ মানুষ তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সেখানে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে এবং গত এক বছরে আরও ১,৪৬০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। গাজার বাসিন্দারা এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন এবং অনেকে তাদের বাস্তুচ্যুতি নিয়ে ভীত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এই দিনটি পালিত হয়েছে। জার্মানির বার্লিনে ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটে ইহুদি শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন একটি ভিজিল আয়োজন করে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুল্লা ফন ডের লিয়েনও এই হামলার নিন্দা জানিয়ে শান্তির ডাক দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সাথে কথা বলে ইসরায়েলি জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, হামাস তাদের বিবৃতিতে ৭ অক্টোবরের হামলাকে একটি ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং একে ইসরায়েলের আরোপিত কষ্টের ‘স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া’ বলে দাবি করেছে।

