পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন অনেক সময়ই মানুষের মানসিক শান্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি ৬৬ বছর বয়সী এক বিধবা নারী তাঁর সমস্যাগ্রস্ত ভাইবোনদের নিয়ে এমনই এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যা নিয়ে তিনি অভিভাবকত্ব ও জীবনযাপন বিষয়ক কলামিস্ট অ্যানালিসা বার্বিয়েরির কাছে পরামর্শ চেয়েছেন।
ওই নারী জানান, তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজো। অন্য দুই ভাইবোনই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, আর্থিক সংকট অথবা উভয় সমস্যায় জর্জরিত। বিপরীতে, তিনি একাই উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে একটি সফল কর্মজীবন শেষ করে এখন আরামদায়ক অবসর কাটাচ্ছেন। তাঁর অন্য ভাইবোনদের মতো কখনো কারাগারেও যেতে হয়নি। বড় বোন সম্প্রতি ভুল করে তাঁর নতুন প্রেমিকের জন্য পাঠানো কিছু অন্তরঙ্গ ছবি এই মেজো বোনকে পাঠিয়ে দেন। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা আপত্তিকর আচরণ ও কথার ভিড়ে এই ঘটনাটিই তাঁর জন্য শেষ সীমা হয়ে দাঁড়ায়।
বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেজো বোনই পরিবারের কার্যত মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। নিজের ভাইবোনদের থেকে দূরে সরে গিয়ে কীভাবে অপরাধবোধ ছাড়া নিজের মানসিক শান্তি রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন।
এই বিষয়ে সাইকোঅ্যানালিটিক সাইকোথেরাপিস্ট সুজানা আবসে বলেন, এই পরিস্থিতিটি মূলত ‘সারভাইভার গিল্ট’ বা ভালো থাকার অপরাধবোধের দিকে ইঙ্গিত করে, যা সাধারণত বড় কোনো ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়। তিনি মনে করেন, ভাইবোনদের দায়িত্ব নিতে গিয়ে ওই নারী একধরনের ক্ষোভ ও অপব্যবহারের শিকার হওয়ার অনুভূতিতে ভুগছেন।
সুজানা আবসে ব্যাখ্যা করেন, অনেক সময় ভাইবোনদের মধ্যে একজন বেশি সফল হলে তাঁর মনে হতে পারে যে তাঁর এই সফলতার কারণেই হয়তো অন্যরা পিছিয়ে পড়েছে। শৈশবে হয়তো তিনি বেশি মনোযোগ পেয়েছিলেন, যার কারণে অন্যরা বঞ্চিত হয়েছিল—এমন একটি ধারণা মনে বাসা বাঁধতে পারে। তবে আবসে স্পষ্ট করে বলেন, এমনটা হয়ে থাকলেও এটি কোনোভাবেই ওই নারীর দোষ বা দায়িত্ব নয়। বিশেষ করে নারীরা যখন নিজেদের মেধা ও আকাঙ্ক্ষা খাটিয়ে সফল হন, তখন অনেক সময় তাঁরা একধরনের লোকলজ্জা বা অপরাধবোধে ভোগেন এবং নিজেদের সাফল্য নিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করেন।
মনোবিদের মতে, ভাইবোনদের এই দুঃখজনক পরিস্থিতি পরিবর্তন করার ক্ষমতা ওই নারীর হাতে নেই। নিজেকে ‘সর্বশক্তিমান’ ভাবার এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে হবে। অন্যকে উদ্ধার করার অতিরিক্ত চেষ্টা নিজের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা অবশিষ্ট ভালোবাসাটুকুও নষ্ট করে ফেলে। তাই ভাইবোনদের তাঁরা যেমন, তেমনভাবেই ভালোবাসতে হবে, কিন্তু নিজের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নয়।
কলামিস্ট অ্যানালিসা বার্বিয়েরিও এই বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, নিজেকে রক্ষা করার সবচেয়ে বড় উপায় হলো অতিরিক্ত দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া। ভাইবোনদের সাহায্য করা যেতে পারে, তবে তা যেন নিজের ক্ষতি করে না হয়। নিজের মনের ক্ষোভকে একটি সংকেত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত, যা মনে করিয়ে দেয় যে আপনি ক্ষমতার চেয়ে বেশি কাজ করছেন। পরিবার থেকে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করা সহজ নয়। এর চেয়ে বরং স্বামী মারা যাওয়ার পর কঠিন সময়ে কারা পাশে ছিলেন, তাঁদের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। নিজেকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, “আমি আমার ভাইবোনদের জন্য দায়ী নই।”

