‘সব হারিয়েছি’: গাজা যুদ্ধ যেভাবে বদলে দিয়েছে ফিলিস্তিনি পুরুষদের জীবন

গাজায় চলমান সংঘাত ফিলিস্তিনি পুরুষদের জীবনে যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে আলোচনা খুব একটা চোখে পড়ে না। যুদ্ধ কেবল তাঁদের ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়নি, বরং তাঁদের আত্মপরিচয়, পারিবারিক ভূমিকা এবং মানসিক জগতকেও ওলটপালট করে দিয়েছে। গাজার চারজন বেসামরিক বাসিন্দা তাঁদের জীবনের এই চরম পরিবর্তনের গল্প তুলে ধরেছেন।

৩৯ বছর বয়সী আহমেদ যুদ্ধের আগে অত্যন্ত ব্যস্ত ও সফল জীবন পার করছিলেন। তিনি ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্য যাচাই বিষয়ে পিএইচডি করার পাশাপাশি তিনটি কাজ করতেন—একটি বেতারের উপস্থাপক, স্থানীয় একটি ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইটের সম্পাদক এবং একটি একাডেমিক সেন্টারের গবেষক হিসেবে। নিজের মেধা প্রকাশের পাশাপাশি পরিবারের ভরণপোষণ করতে পেরে তিনি বেশ সুখী ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ তাঁদের জীবনকে পুরোপুরি তছনছ করে দিয়েছে। যে আহমেদ আগে গবেষণার কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন, এখন তাঁকে পানির পাত্র নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কিংবা টয়লেট ব্যবহারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

আহমেদ জানান, এই যুদ্ধ তাঁর আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত করেছে। আগে তিনি যৌথ পরিবারে নিজের ভাইবোন ও বাবা-মায়ের সঙ্গে একই ভবনের আলাদা ফ্ল্যাটে থাকতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে তাঁদের সবাইকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয় এবং তখন থেকে তাঁরা তাঁবুতে বাস করছেন। এই নতুন জীবনে কোনো গোপনীয়তা না থাকায় দম্পতিদের মধ্যে এক ধরনের আবেগীয় নীরবতা তৈরি হয়েছে। আহমেদ বলেন, আগে বাড়ি ছিল নিজের একটি স্বাধীন রাজ্য, যেখানে দিনশেষে ক্লান্তি দূর করা যেত এবং স্বাধীনভাবে কথা বলা যেত। এখন সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হয়, কোনো গোপনীয়তা নেই। নিজের স্ত্রীর কাছেও আবেগ প্রকাশ করা যায় না, কারণ সবাই সব শুনতে পায়। একজন বাবা হিসেবে তিনি পরিবারের কাছে আশার আলো হয়ে থাকতে চান। তিনি বলেন, তাঁর এমন সন্তান রয়েছে যারা জানেই না দেয়াল কী, বিছানা কী কিংবা সিঁড়ি কী জিনিস। তিনি তাদের বলেন সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু মনে মনে অজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে থাকেন।

৪০ বছর বয়সী নিদাল ২০২৩ সালে গাজা সিটিতে নিজের ফ্ল্যাট ব্লকের একটি ছোট ঘর থেকে কিস্তিতে মোবাইল ফোন ও গৃহস্থালি পণ্য বিক্রির ব্যবসা করতেন। মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে টাকা আদায় করার মাধ্যমে তাঁর অনেক বন্ধু ও পরিচিত তৈরি হয়েছিল। জীবন বেশ ভালোই কাটছিল। কিন্তু একটি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাঁর ভাবি মারা যাওয়ার পর তাঁদের পুরো পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। এরপর একটি স্কুলে আশ্রয় নেওয়ার পর সেখানে দ্বিতীয় দফা বিমান হামলায় তাঁর মেয়ে মালেক নিহত হয়। এই ট্র্যাজেডি নিদালকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তিনি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি রাগী ও অশান্ত। মানুষজন চরম সংকটে থাকায় পাওনা টাকা চাইতে তাঁর লজ্জা লাগে। তিনি নিজেকে এখন আর বেকার বলতে চান না, বরং নিজেকে একজন অসহায় মানুষ মনে করেন, যিনি পরিবারের জন্য ন্যূনতম খাবারটুকুও জোগাড় করতে পারছেন না। নিদাল বলেন, আল্লাহ যেন প্রতিটি পুরুষকে এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেন—সন্তানদের চোখের সামনে একজন বাবার এভাবে ভেঙে পড়া অত্যন্ত বেদনার।

২৪ বছর বয়সী প্রযুক্তিবিদ্যার ছাত্র হুসেইন যুদ্ধের আগে নিজের ফ্ল্যাটে থাকতেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কর্মশালা পরিচালনা করতেন। বিয়ের পরিকল্পনাও করছিলেন তিনি। কিন্তু যুদ্ধের শুরুতেই তাঁর বাড়ি বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায়, বাবা গুরুতর আহত হন এবং ভাবিকে টানা ছয় মাস হাসপাতালে কাটাতে হয়। হুসেইনকে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছিল। বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি প্রথমে ফোন চার্জ দেওয়া ও মেরামতের কাজ শুরু করেন, পরে ফোন কেনাবেচা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কাজ বেছে নেন। এত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পেরে তিনি গর্বিত হলেও প্রথম দিকে নিজের এই পেশা নিয়ে ভীষণ লজ্জাবোধ করতেন। বর্তমানে তাঁবুতে বসবাস করা হুসেইন বলেন, এই অবস্থায় বিয়ে করার কথা ভাবা যায় না, কারণ একটি পরিবারের জন্য ন্যূনতম গোপনীয়তা ও পানির ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তবে তিনি এখনো আশা হারাননি। তিনি বিশ্বাস করেন, তরুণ প্রজন্মই এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে আবার গড়ে তুলবে এবং আগের চেয়েও সুন্দর করে তুলবে।

২২ বছর বয়সী হামজা যখন উত্তর গাজার জাবালিয়ায় দ্বিতীয় বর্ষের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র, তখন যুদ্ধ শুরু হয়। ইসরায়েলি বাহিনীর দক্ষিণে চলে যাওয়ার নির্দেশ অমান্য করে তিনি উত্তর গাজাতেই থেকে যান এবং ফ্রন্টলাইন ডাক্তার হিসেবে স্বেচ্ছাসেবী কাজ শুরু করেন। মাথায় আঘাত পাওয়া অসংখ্য রোগীর ভিড়ে উত্তর গাজায় তখন মাত্র তিনজন নিউরোসার্জন ছিলেন। এই কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করা হামজাকে একটি উদ্দেশ্য এনে দেয়। তিনি নিজেকে একজন বীর হিসেবে মনে করেন, কারণ একজন ছাত্রের পক্ষে এই অসম্ভব দায়িত্ব পালন করা সহজ ছিল না। যুদ্ধ হামজাকে তাঁর পরিবারের আরও কাছে নিয়ে এসেছে। আগে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা হামজা এখন পরিবারের গুরুত্ব বোঝেন। তাঁরা সবাই এখন দুই বর্গমিটারের একটি জায়গায় একই তোশকে ঘুমান, একসঙ্গে অভুক্ত থাকেন এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হন। এই পরিস্থিতি তাঁদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। যুদ্ধের আগে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বিয়ে পিছিয়ে দিলেও, এখন তিনি দ্রুত পরিবার গঠন করতে চান। হামজা বলেন, যুদ্ধের সময় যখন মানুষ বিলুপ্তির আশঙ্কা বোধ করে, তখন তারা বংশবৃদ্ধির প্রতি আকৃষ্ট হয়। অনেক কিছু হারানোর পর এখন সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার একটি তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে।

শিরোনাম :
অভিবাসন অভিযানে আইসিই-র সমালোচনায় রিপাবলিকানরা, ক্ষুব্ধ টম হোমান দামুড়হুদায় তুচ্ছ ঘটনায় ফল বিক্রেতাকে লোহার শিকে বিদ্ধ করে হত্যা ডব্লিউডব্লিউই-র পুরনো মজার মুহূর্ত স্মরণ করলেন রেনি পকেট যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের অভিযোগে তিন কর্মীকে ছাঁটাই করল ওপেনএআই তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ানডে দলে ফিরলেন আলি খান সিয়াটলের ফেডারেল প্রসিকিউটরকে বরখাস্তের নির্দেশ আটকে দিলেন বিচারক ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর নতুন নাটক ‘মায়ারে’ নিয়ে পর্দায় ফিরলেন আরশ-সুনেরাহ মানসিক স্বাস্থ্যের খাতিরে অবসরে গ্লুচেস্টারশায়ারের পেসার ক্রেইগ মাইলস অভিবাসন অভিযানে আইসিই-র সমালোচনায় রিপাবলিকানরা, ক্ষুব্ধ টম হোমান দামুড়হুদায় তুচ্ছ ঘটনায় ফল বিক্রেতাকে লোহার শিকে বিদ্ধ করে হত্যা ডব্লিউডব্লিউই-র পুরনো মজার মুহূর্ত স্মরণ করলেন রেনি পকেট যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের অভিযোগে তিন কর্মীকে ছাঁটাই করল ওপেনএআই তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ানডে দলে ফিরলেন আলি খান সিয়াটলের ফেডারেল প্রসিকিউটরকে বরখাস্তের নির্দেশ আটকে দিলেন বিচারক ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর নতুন নাটক ‘মায়ারে’ নিয়ে পর্দায় ফিরলেন আরশ-সুনেরাহ মানসিক স্বাস্থ্যের খাতিরে অবসরে গ্লুচেস্টারশায়ারের পেসার ক্রেইগ মাইলস