যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউএইচসিএ) নৈশভোজে সংবাদমাধ্যমের তীব্র সমালোচনা ও রসিকতা করেছেন। তিন মাস আগে এক গুলির ঘটনার কারণে স্থগিত হওয়া এই আয়োজনটি কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা উদযাপনের এই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প এমন সব গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন, যাদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
অনুষ্ঠানে নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা পুরস্কার গ্রহণ করার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্প নিজে বিজয়ী সাংবাদিকদের সঙ্গে করমর্দন করেন, যার মধ্যে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি দলও ছিল, যারা কলঙ্কিত অর্থদাতা জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের খবর প্রকাশের জন্য পুরস্বৃত হন। সাধারণত এই বার্ষিক অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা হালকা রসিকতা করলেও, ট্রাম্পের বক্তব্যে রসিকতার পাশাপাশি গণমাধ্যমের প্রতি তীব্র আক্রমণও ছিল। ট্রাম্প বলেন, "দ্বিতীয়বার সবসময়ই ভালো হয়" এবং তিনি গণমাধ্যমের "অধিকাংশকেই" শ্রদ্ধা করেন বলে উল্লেখ করেন।
তবে দ্রুতই তাঁর বক্তব্যের সুর বদলে যায়। তিনি গণমাধ্যমকে "ভুয়া খবর" (ফেক নিউজ) বলে আক্রমণ করেন এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের "ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট সিন্ড্রোমে" আক্রান্ত বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্প রসিকতা করে বলেন, "এই জায়গাটি আসলে ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবচেয়ে বড় সমাবেশ। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ ভাগ্যবান যে আমাদের আগের ডিনারটি মাঝপথে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল… আমি আপনাদের পেছনে লাগতে যাচ্ছিলাম।" ট্রাম্প আরও বলেন যে, তিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর সংবাদ শিল্প "দেউলিয়া" হয়ে যাবে কারণ তখন সংবাদ লেখার মতো কেউ থাকবে না। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি একটি "ট্রাম্প ২০২৮" ক্যাপ মাথায় দেন এবং রসিকতা করে বলেন, "আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা ঘোষণা করে আনন্দিত।" মার্কিন সংবিধানে দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকার সুযোগ না থাকলেও ট্রাম্প প্রায়ই তৃতীয় মেয়াদে লড়ার ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন। ১৯৫১ সালে অনুসমর্থিত সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী এই সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট টানা চার মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর আনা হয়েছিল।
এবারের অনুষ্ঠানটি ওয়াশিংটন হিলটন থেকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। গত এপ্রিলে হিলটনে গুলির ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে সমালোচনার মুখে ভেন্যু পরিবর্তন করা হয়। সেদিনের হামলায় আহত সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তা ভিক্টর গঞ্জালেজকে ট্রাম্প সাহসিকতার জন্য পুরস্কৃত করেন। এপ্রিলে ৩১ বছর বয়সী কোল টমাস অ্যালেন নামের এক বন্দুকধারী ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। ডব্লিউএইচসিএ সভাপতি ও সিবিএস নিউজের সাংবাদিক ওয়েইজিয়া জিয়াং বলেন, তাঁরা কোনো সহিংসতাকে শেষ কথা হতে দেবেন না এবং আগামী বছর এই অনুষ্ঠান আবারও ওয়াশিংটন হিলটনে ফিরে যাবে। ট্রাম্পও তাঁর বক্তব্যে বলেন, "তিন মাস আগে আমি যেমনটা বলেছিলাম, অনুষ্ঠান চলতেই হবে (শো মাস্ট গো অন)।"
এবারের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ছিল অত্যন্ত কঠোর। হোটেলের চারপাশের বেশ কয়েকটি ব্লক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং পুলিশ ও ন্যাশনাল গার্ডের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। প্রায় ৭০০ জন অতিথিকে কিউআর কোড ও পরিচয়পত্র দিয়ে দুইবার তল্লাশি করে রিস্টব্যান্ড দেওয়া হয়, যা এপ্রিলে পরিকল্পিত ২,০০০ জনের তুলনায় বেশ ছোট আকারে সম্পন্ন হয়। অতিথিদের সিক্রেট সার্ভিসের সশস্ত্র কর্মকর্তাদের পাশ দিয়ে একক সারিতে প্রবেশ করতে হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প আমেরিকানদের বাকস্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আমরা বুলেটের মাধ্যমে নয়, বরং উন্মুক্ত ও জোরালো বিতর্কের মাধ্যমে আমাদের মতপার্থক্য নিরসন করি। বন্দুকধারী কোনো উন্মাদ বিজয়ী তা কখনই পরিবর্তন করতে পারবে না। আমরা তা কখনই হতে দিতে পারি না।"
হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হলো, যেখানে মাত্র এক সপ্তাহ আগেই ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী নিরাপত্তা বিষয়ক ভাষণ প্রচার না করায় বেশ কয়েকটি মার্কিন নেটওয়ার্কের লাইসেন্স পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ, এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল, ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এবং কমার্স সেক্রেটারি হাওয়ার্ড লুটনিক উপস্থিত ছিলেন।

