যুদ্ধবিরতি ঘোষণার প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় একটি হাসপাতালও পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হতে পারেনি। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস-ইসরায়েল’ (পিএইচআরআই) বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর আংশিকভাবে সচল হাসপাতালের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও, গাজার স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত কোনো পুনরুদ্ধার বা উন্নতি হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যা সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। একই সঙ্গে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে হাজার হাজার রোগী জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজার ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৪টি আংশিকভাবে সচল ছিল। এক বছর পর এই সংখ্যা বেড়ে ২০টিতে পৌঁছালেও পূর্ণ মাত্রায় সেবা দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই কোনোটিই। এছাড়া, ২০২৫ সালের অক্টোবরে আইসিইউ শয্যা ছিল ১০৩টি, যা ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০৪টিতে। কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা আরও সংকুচিত হয়েছে; আগে ১৭ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই সুবিধা থাকলেও ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা নেমে এসেছে ১২ শতাংশে। পুরো উপত্যকায় কোনো এমআরআই (MRI) সেবা সচল নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির প্রথম সাত মাসেই স্বাস্থ্য খাতের ওপর আরও অন্তত ১৪৩টি হামলা চালানো হয়েছে। ইসরায়েলি সমন্বয়কারী সংস্থা কোগাট (COGAT)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে গাজায় প্রবেশের অনুমোদন পাওয়া চিকিৎসাসামগ্রীর ৬৯ শতাংশই শেষ পর্যন্ত উপত্যকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। সীমান্ত পারাপার বন্ধ এবং যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞার কারণে রোগীরা চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে পারছেন না এবং অনেকেই স্থানান্তর বা সরিয়ে নেওয়ার অপেক্ষায় থেকে মারা যাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুদ্ধপূর্ব সময়ে গাজা থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ১০০ জন রোগী চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র ৩,৪২৩ জন রোগীকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছে, যা আগের তুলনায় তিন থেকে ছয় গুণ কম। এদিকে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ১,৪২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫,১৫০ জন আহত হয়েছেন বলে ডব্লিউএইচও-এর হেলথ ক্লাস্টার জানিয়েছে।
অন্যদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুর্শ আনাদোলু বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছেন, তিন বছরের "গণহত্যা" ও ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজার অর্ধেকেরও বেশি ডায়ালাইসিস রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আগে গাজায় প্রায় ১,৪০০ ডায়ালাইসিস রোগী ছিলেন, নিয়মিত চিকিৎসা না পেয়ে তা কমে এখন মাত্র ৬০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি আহত মানুষের জন্য প্রায় ৫ লাখ জটিল অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, কিন্তু গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তা করার মতো কোনো সামর্থ্য নেই।
আল-বুর্শ আরও জানান, ইসরায়েল এখনো গাজার ৮৮ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে আটক করে রেখেছে। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী রোগের ওষুধের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। গাজার ২০ হাজারের বেশি রোগী ও আহত মানুষের জরুরি ভিত্তিতে বিদেশে চিকিৎসা প্রয়োজন। প্রতিদিন ৩০০ রোগীকে বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও ইসরায়েল তা বাস্তবায়ন করছে না; বর্তমানে দিনে মাত্র ২৫ জনকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। গত এপ্রিলে জাতিসংঘের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গাজায় ৪ হাজার শিশুসহ ১৮,৫০০-এর বেশি রোগীর জরুরি চিকিৎসা স্থানান্তর প্রয়োজন।
গাজার স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান সংকটের চিত্র তুলে ধরে আল-বুর্শ সতর্ক করেছেন যে, সেখানে চিকিৎসাসামগ্রীর মজুদ বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। শয্যা ও জরুরি ওষুধের ঘাটতি ৫২ শতাংশ এবং অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি ৫৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ইসরায়েলি অভিযান শুরুর পর থেকে গাজায় নতুন কোনো চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তিনি অবিলম্বে গাজায় ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করতে, হাসপাতালগুলো পুনর্নির্মাণ করতে এবং আহতদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিতে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান।

