আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। একই সঙ্গে ডজনখানেক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর এবং হাজার হাজার রাজ্য পর্যায়ের পদের ভাগ্যও ফয়সালা হবে এই ভোটে। অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা, ইরান যুদ্ধ, অভিবাসন সংক্রান্ত বিতর্ক, সরকারি দুর্নীতি নিয়ে উৎকণ্ঠা এবং দ্রুত বিকাশমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ে জটিল সামাজিক পরিস্থিতির আবহেই জমে উঠেছে এবারের নির্বাচনি প্রচারণা। বিভিন্ন জরিপ সংস্থার কৌশল ও ভিন্নতা থাকলেও সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পকেটের টানই যে প্রধান নিয়ামক, সে বিষয়ে সবাই একমত। অক্টোবর মাসে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক সংকটই ভোটারদের দুশ্চিন্তার শীর্ষে রয়েছে। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসে এমারসন কলেজের এক জরিপে দেখা যায়, ইরান যুদ্ধ, কর্মসংস্থান, শুল্ক নীতি, জ্বালানি তেলের দাম, অভিবাসন এবং এআই নিয়ন্ত্রণ—এই বিষয়গুলোই নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে।
নির্বাচনি মাঠে সবকিছুর উপরে অবস্থান করছে মার্কিন জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি। গত সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩.৭ শতাংশ, তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলছে জ্বালানি তেল, বাসস্থান, বিদ্যুৎ, দৈনন্দিন মুদিপণ্য এবং ব্যাংক ঋণের ক্রমবর্ধমান খরচ। পিউ রিসার্চের জরিপ অনুযায়ী, ৬৫ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করছে। পাশাপাশি জোসেফ রেইনি সেন্টার ফর পাবলিক পলিসির অপর এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ ভোটার খাদ্যপণ্য, জ্বালানি কিংবা বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিলকে তাদের শীর্ষ তিনটি সমস্যার মধ্যে রেখেছেন। ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক নীতি নিয়েও বিতর্ক তীব্র হচ্ছে; বিরোধীরা একে উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী করছেন, অন্যদিকে প্রশাসন দাবি করছে এই শুল্ক মার্কিন শিল্পকে সুরক্ষা দিচ্ছে এবং রাজস্ব বাড়াচ্ছ।
বৈদেশিক যুদ্ধও এখন মার্কিন ভোটারদের জন্য একটি প্রত্যক্ষ ঘরোয়া অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানির খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং মার্কিন জনগণের কাছে এটি চরম অপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সেপ্টেম্বর মাসে এমারসনের জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের কাছে ইরান যুদ্ধই ছিল এককভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, এই সংঘাত পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকায় অনুমোদন দিয়েছেন মাত্র ৩৪ শতাংশ ভোটার। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীও ইতোমধ্যেই এই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি গত সেপ্টেম্বর মাসে চারজন রিপাবলিকান সেনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একযোগে ভোট দিয়ে ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নেন।
ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক স্তম্ভ অভিবাসন ইস্যুটি এখন পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি জটিল রূপ নিয়েছে। পুনর্নির্বাচিত হয়ে বড় ধরনের বিতাড়ন অভিযানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই (ICE)-এর আগ্রাসী অভিযান এবং আটক কেন্দ্রে মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের সমর্থন কমতে শুরু করেছে। রয়টার্স/ইপসোসের তথ্যমতে, ৫৫ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির বিরোধিতা করেছেন। মেরিস্টের জরিপে দেখা গেছে, অভিবাসন ইস্যুতে কোন দলের ওপর বেশি আস্থা রাখা যায়—সেই প্রশ্নে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের অবস্থান এখন প্রায় সমান, যা ২০২৪ সালে রিপাবলিকানদের স্পষ্ট অগ্রগতির তুলনায় এক বড় ধরনের পরিবর্তন। বিশেষ করে ল্যাটিনো ভোটারদের মধ্যে এই পরিবর্তনের ধারা স্পষ্ট। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জেলাগুলোতে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ ল্যাটিনো ভোটার ট্রাম্প প্রশাসনের গণবিতাড়ন ও অভিবাসন দমন নীতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচনি লড়াইয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠেছেন, বিশেষ করে তিনি যেভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ট্রাম্প ভোটারদের সরাসরি অনুরোধ করেছেন তারা যেন ব্যালট পেপারে তাকেই দেখছেন বলে মনে করেন, যা এই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে তার দ্বিতীয় মেয়াদের ওপর এক ধরনের গণভোটে পরিণত করেছে। পিউ-এর উম্মুক্ত জরিপে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তার পরপরই সরকারের নীতি-নৈতিকতার স্থান, যা ৯ শতাংশ ভোটার উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্টের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৯৭ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে কোনো না কোনো মাত্রায় দুর্নীতি বিদ্যমান রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি এখন কেবল ল্যাপটপের পর্দায় সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি নির্বাচনি প্রচারণায় বড় জায়গা করে নিয়েছে। চাকরি হারানোর ভয়, নিরাপত্তা ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভোটাররা এখন চিন্তিত বিশাল আকৃতির ডেটা সেন্টারগুলো নিয়ে। পিউ-এর জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেক আমেরিকান জানিয়েছেন, অর্থনীতিতে এআই-এর ভূমিকা নিয়ে তারা মারাত্মক উদ্বিগ্ন। এছাড়া ৫৯ শতাংশ ভোটার বলেছেন, যেসব রাজনৈতিক নেতা তাদের স্থানীয় এলাকায় সুবিশাল ডেটা সেন্টার তৈরিতে সমর্থন দেন, তাদের তারা পছন্দ করেন না। এমারসনের সেপ্টেম্বর জরিপে অভিবাসন ও জ্বালানি তেলের দামের পরেই এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আশ্চর্যজনকভাবে উঁচুতে স্থান পেয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে ডেটা সেন্টারগুলোর অবস্থান নিচে থাকলেও ওহাইওর মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে এটি বড় নির্বাচনি ট্রাম্পকার্ডে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ, পানি এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের লড়াই চলছে। ভোটের ঠিক আগের দিনগুলোতে মার্কিন কংগ্রেসকেও এআই সার্ভার ফার্মগুলোর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচের বিল কে দেবে তা নিয়ে বিতর্ক করতে দেখা গেছে, যা প্রমাণ করে ২০২৬ সালে ডেটা সার্ভারও রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে।
মার্কিন সংস্কৃতির ঐতিহ্যগত অন্যান্য বিতর্কগুলো ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে মূল চালিকাশক্তি না হলেও স্বাস্থ্যসেবার মতো কিছু ক্ষেত্র ভোটারদের মধ্যে বিভাজন বজায় রেখেছে। স্বাস্থ্যবিমার খরচ, ওষুধের আকাশচুম্বী দাম এবং চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগের মতো বিষয়টি মার্কিন নির্বাচনে সব সময়ই একটি স্থায়ী ভাবনার জায়গা। জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান যুদ্ধ কিংবা অভিবাসনের মতো এগুলো হয়তো জাতীয় প্রচারণায় একচ্ছত্র প্রাধান্য পাচ্ছে না, তবে দুই দলের মূল সমর্থক গোষ্ঠীকে ভোটকেন্দ্রে টানতে এগুলো এখনো অত্যন্ত প্রভাবশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

