যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে তিন সন্তানকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ৩৬ বছর বয়সী লিন্ডসে ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে পুনরায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার ইচ্ছার কথা আদালতে জানিয়েছেন প্রসিকিউটররা। গত ২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এক শুনানিতে এ কথা জানানো হয়। এর আগে বিচারকদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারার (হাং জুরি) কারণে মামলাটি অমীমাংসিত অবস্থায় আটকে গিয়েছিল।
ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি ডাক্সবারির নিজ বাড়ির বেজমেন্টে ব্যায়ামের ব্যান্ড দিয়ে পেঁচিয়ে তার তিন সন্তান—৫ বছর বয়সী কোরা, ৩ বছর বয়সী ডসন এবং ৮ মাস বয়সী ক্যালানকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। ক্ল্যান্সির আইনজীবী কেভিন রেডিংটন দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি পোস্টপার্টম সাইকোসিসে (প্রসবোত্তর মানসিক ব্যাধি) ভুগছিলেন। ম্যাসাচুসেটসের আইন অনুযায়ী মানসিক অসুস্থতাজনিত কারণে তাকে অপরাধমূলকভাবে দায়ী করা যায় না। গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে জুরি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারায় বিচারপতি অচলাবস্থা (মিস্ট্রায়াল) ঘোষণা করেছিলেন।
প্লাইমাউথ কাউন্টির সহকারী জেলা অ্যাটর্নি জেনিফার স্প্রাগ আদালতে জানান, প্রসিকিউশন পক্ষ ক্ল্যান্সির পুনরায় বিচার করতে চায়। তবে বিচারক উইলিয়াম সালিভান আসামিপক্ষের দায়ের করা তিন মূল আবেদনের আদেশ দেওয়ার পরই চূড়ান্ত অভিযোগ নির্ধারণ করা হবে। তিনি আদালতকে বলেন, "মাননীয় আদালত, এটি একটি পুনরায় বিচার হবে। কিন্তু এটি কেমন রূপ নেবে তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। আমরা এখনো সেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাইনি।"
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী কেভিন রেডিংটন যুক্তি দেখান, আগামী বিচারে ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির হত্যা মামলা নাকি অপেক্ষাকৃত কম অপরাধের অভিযোগ আনা হবে, তা নির্ধারণ করতে এসব আবেদনের নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
বিচারক সালিভান আগামী জুনে বাধ্যতামূলক অবসরে যাচ্ছেন। তার অবসর গ্রহণের আগেই আগামী বসন্তে এই মামলার বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার আবেদন জানান রেডিংটন। বিচারক সালিভান আগামী ১৬ নভেম্বর উভয় পক্ষকে পুনরায় শুনানিতে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছেন। ওই দিন যদি আসামিপক্ষের মামলা খারিজের আবেদন নাকচ হয়, তবে নতুন বিচারের তারিখ নির্ধারণ করা হবে। বিচারক সালিভান মার্চ মাসেই বিচার কাজ শুরু করতে আশাবাদী বলে প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মার্টিন উইনবার্গ ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ পুরোপুরি খারিজের দাবি জানান এবং অচলাবস্থার পেছনে ভূমিকা রাখা জুরি সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্তের আহ্বান জানান। উইনবার্গ দাবি করেন, একজন জুরি সদস্য যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের আইনি নির্দেশনা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এমন তথ্য জানার পরও বিচারক সালিভান ওই জুরিকে আরও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ না করে গত ৪ সেপ্টেম্বর মিস্ট্রায়াল ঘোষণা করেন। উইনবার্গের মতে, পুনরায় বিচার শুরু করা সংবিধান প্রদত্ত 'ডাবল জিওপার্ডি' (একই অপরাধে দুবার বিচার না হওয়ার অধিকার) সুরক্ষার লঙ্ঘন হবে।
বিচারক সালিভান প্রক্রিয়ার মধ্যে হস্তক্ষেপ করে উল্লেখ করেন যে, তিনি মিস্ট্রায়াল ঘোষণার আগেই প্রত্যেক জুরির সাথে আলাদাভাবে কথা বলেছিলেন। তবে উইনবার্গ দাবি করেন, জুরি রুমে ঠিক কী ঘটছিল তা সঠিকভাবে তদন্ত করার জন্য ওই জিজ্ঞাসাবাদ সাংবিধানিকভাবে যথেষ্ট ছিল না।
প্রসিকিউশন পক্ষ আসামিপক্ষের এই খারিজের আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করে। সহকারী জেলা অ্যাটর্নি জেনিফার স্প্রাগ বলেন, জুরিরা বারবার অচলাবস্থার কথা জানানোর পরই নিয়মমাফিক মিস্ট্রায়াল ঘোষণা করা হয়েছিল। গোপন আলোচনার বিষয়ের গভীরে গিয়ে জুরিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার আইনি সুযোগ বিচারকের ছিল না। তিনি বলেন, "অচল হয়ে পড়া জুরির ক্ষেত্রে যেকোনো এক পক্ষ অবলম্বন করে সিদ্ধান্ত দেওয়া বিচারকের কাজ নয়।" বিচারক সালিভান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে দেবেন বলে জানান।
এ ছাড়া জুরি ছাঁটাইয়ের পর ওই অভিযুক্ত জুরি সদস্যের ফোন, ফোন রেকর্ড এবং গোপনীয় প্রশ্নাবলী তলবের আবেদন জানান রেডিংটন। শুনানিতে রেডিংটন অভিযোগ করেন, ওই জুরি সদস্য বিচার চলাকালীন বেআইনিভাবে সেলফোন ব্যবহার করেছেন এবং 'অলট্রুইস্টিক ফিলিসাইড' (সন্তান হত্যা সম্পর্কিত বিশেষ ধারণা) বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি নিজের অপরাধমূলক ইতিহাস সম্পর্কেও প্রশ্নাবলীতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন।
অভিযুক্ত জুরি সদস্যের পক্ষে আইনজীবী হিদার ও'কনোর এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, মিস্ট্রায়ালের সিদ্ধান্ত তৎকালীন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছিল এবং জুরি ভেঙে দেওয়ার পর এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে তার মক্কেল এসব অভিযোগের কোনোটিই স্বীকার করছেন না বলে তিনি পরিষ্কার করেন।
একই শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আইনজীবীদের গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা (গ্যাগ অর্ডার) জারি করার আবেদন জানানো হয়, যাতে মামলার বিচারে জনমত প্রভাব ফেলতে না পারে। স্প্রাগ অভিযোগ করেন, রেডিংটন রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন এবং অন্যান্য জুরিদের 'বঞ্চিত করা হয়েছে' বলে পাবলিক মিডিয়ায় নানা মন্তব্য করেছেন। আসামিপক্ষ এই আবেদনের বিরোধিতা করে এটিকে মুক্ত বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে এবং বলে যে এর ফলে তাদের ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্টের অধিকার লঙ্ঘিত হবে। বিচারক সালিভান এই বিষয়টিও পর্যালোচনার অধীনে রেখেছেন।

