যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উচ্চশিক্ষায় বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন)। সিবিএস নিউজের হাতে আসা একটি খসড়া স্মারকলিপি (মেমো) অনুযায়ী, সামরিক একাডেমি ও ওয়ার কলেজগুলোতে বেসামরিক শিক্ষকদের স্থায়ী নিয়োগ বা ‘টেনিউর’ প্রথা বাতিল এবং পাঠ্যক্রমের আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
‘রিফোকাসিং দ্য মিলিটারি সার্ভিস একাডেমিস অ্যান্ড সিনিয়র সার্ভিস কলেজ অন ওয়ারফাইটার এডুকেশন’ শীর্ষক এই খসড়া নির্দেশনায় ওয়েস্ট পয়েন্টের ইউএস মিলিটারি একাডেমি, অ্যানাপোলিসের ইউএস নেভাল একাডেমি এবং কলোরাডোর ইউএস এয়ার ফোর্স একাডেমির মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেসামরিক শিক্ষকদের টেনিউর প্রথা বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।
খসড়া স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, টেনিউর বা স্থায়ী নিয়োগ প্রথাটি মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে এটি প্রায়শই স্থবিরতা, আত্মতুষ্টি এবং অনমনীয়তা তৈরি করে। এতে আরও দাবি করা হয়, এই ব্যবস্থার কারণে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের যুদ্ধের উপযোগী করে গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে শিক্ষকরা তাদের নিজস্ব গবেষণার দিকে বেশি মনোযোগী হন।
বেসামরিক শিক্ষকদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এই খসড়া প্রস্তাবটি সরাসরি শ্রেণীকক্ষের পাঠ্যক্রমেও হস্তক্ষেপ করবে। এতে পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের সামরিক একাডেমি ও সিনিয়র ওয়ার কলেজগুলোর প্রতিটি কোর্সের ‘লাইন-বাই-লাইন’ বা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কোর্স কেবল একটি মানদণ্ডে বিচার করা হবে—তা হলো বিষয়টি সরাসরি ‘কৌশলগত, অপারেশনাল এবং যুদ্ধক্ষেত্রের নেতৃত্ব’ এবং ‘যুদ্ধপ্রস্তুতি’ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে কি না। যে বিষয়গুলো অপ্রয়োজনীয় বা ‘আদর্শিক এজেন্ডা দ্বারা প্রভাবিত’ বলে বিবেচিত হবে, সেগুলো বাদ দেওয়া হবে। তবে কোন মানদণ্ডে এগুলো নির্ধারণ করা হবে, তা খসড়ায় স্পষ্ট করা হয়নি। এ বিষয়ে পেন্টাগন কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই নীতিগত প্রস্তাবটির পেছনে মূল ভূমিকা রাখছেন জনবল ও রিজার্ভ বিষয়ক সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব টিম ডিল। সাবেক এই আর্মি গ্রিন বেরে কর্মকর্তা এর আগে টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কর্মকর্তারা আরও জানান, প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের জন্য ওয়েস্ট পয়েন্টের স্নাতক ও কর্মী ও প্রস্তুতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অ্যান্থনি টাটা এবং প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। খসড়া মেমোতে টেনিউর প্রথা ‘অবিলম্বে কার্যকর’ উপায়ে বাতিলের কথা বলা হলেও, এটি বাস্তবায়নের জন্য টাটাকে ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এর আগে পেন্টাগন হার্ভার্ড, প্রিন্সটন, কলাম্বিয়া ও ইয়েল-এর মতো বেসামরিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতকোত্তর শিক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। হেগসেথ এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘আমেরিকা-বিরোধী ক্ষোভের কারখানা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
সামরিক একাডেমিগুলোতে বেসামরিক শিক্ষকদের টেনিউর প্রথা কয়েক দশক ধরে চালু রয়েছে। গত বছর সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে ওয়েস্ট পয়েন্টের সুপারিনটেনডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্টিভেন গিল্যান্ড এবং নেভাল একাডেমির তৎকালীন সুপারিনটেনডেন্ট ভাইস অ্যাডমিরাল ইভেট ডেভিডস টেনিউর প্রথার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, এটি প্রতিভাবান শিক্ষকদের আকৃষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে তারা এটিও স্পষ্ট করেন যে, অসদাচরণ বা প্রাতিষ্ঠানিক মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে টেনিউরপ্রাপ্ত শিক্ষকদেরও চাকরিচ্যুত করার নিয়ম রয়েছে। এয়ার ফোর্স একাডেমির সুপারিনটেনডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল টনি ডি বাউর্নফাইন্ডও একই কথা নিশ্চিত করেন। ২০০৫ সালের ওয়েস্ট পয়েন্টের একটি ফ্যাকাল্টি ম্যানুয়াল অনুযায়ী, অসদাচরণ, আর্থিক সংকট বা প্রোগ্রামের বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণে বেসামরিক শিক্ষকদের অব্যাহতি দেওয়া সম্ভব।
সম্প্রতি ওয়েস্ট পয়েন্টে বেসামরিক শিক্ষকদের জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়া বা মতামত প্রকাশের আগে অনুমতি নেওয়ার একটি নীতি আদালত সাময়িকভাবে স্থগিত করার পর একাডেমি কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে আপিল না করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওয়েস্ট পয়েন্টের দীর্ঘকালীন আইন অধ্যাপক টিম বাকেন ম্যানহাটন ফেডারেল আদালতে এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন। বিচারক ক্যাথি সাইবেল এই স্থগিতাদেশ জারি করেন। বাকেন সিবিএস নিউজকে বলেন, সামরিক একাডেমিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো শক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ জয় করা এবং যুদ্ধ প্রতিরোধ করা। আর এর জন্য যেকোনো বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা ও বিশ্লেষণের স্বাধীনতা থাকা অত্যন্ত জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এই প্রস্তাবটি ওয়েস্ট পয়েন্ট, অ্যানাপোলিসের ইউএস নেভাল একাডেমি এবং কলোরাডোর ইউএস এয়ার ফোর্স একাডেমির পাশাপাশি রোড আইল্যান্ডের নেভাল ওয়ার কলেজ এবং পেনসিলভানিয়ার আর্মি ওয়ার কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
আর্মি ওয়েস্ট পয়েন্ট একাডেমির অধিকাংশ শিক্ষকই সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সামরিক কর্মকর্তা, যেখানে বেসামরিক শিক্ষকরা স্টাফদের একটি ছোট অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯২ সালে, মার্কিন কংগ্রেস একটি ফেডারেল আইন প্রণয়ন করে যা এই সার্ভিস একাডেমিগুলোকে বেসামরিক শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে।

