ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক। তাঁর মতে, জনগণের মধ্যে ভয় ছড়াতে এবং ভিন্নমত দমন করতে দেশটিতে এই সর্বোচ্চ শাস্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, চীনের পর ইরানকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড পরিচালনাকারী দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত বছর দেশটিতে অন্তত ২,১৫৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করেছেন যে, চলতি বছরের জানুয়ারির বিক্ষোভ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর সরকারবিরোধীদের ওপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা আরও বাড়াতে পারে ইরানি কর্তৃপক্ষ। ওই বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছিল।
এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ইরানি কর্তৃপক্ষকে সব ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করার এবং এই শাস্তি পুরোপুরি বাতিলের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "আমাদের এই পৃথিবীতে এমন শাস্তির কোনো স্থান নেই।" মৃত্যুদণ্ড বৃদ্ধির পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি অভিযোগ করেন, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি নিয়ে আসামিদের সাজা দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এবং জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি একটি তিন ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার শুনানিতেই ১২ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে তারা মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছিল যে, কেবল "সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের" ক্ষেত্রেই এই শাস্তি সীমাবদ্ধ রাখা হয়। সম্প্রতি গত সোমবার ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ওমিদ বেহজাদ এবং পুরিয়া সাফওয়াত নামে দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরানের বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগের মিজান নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, তাদের বিরুদ্ধে চলতি যুদ্ধ এবং ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনব্যাপী চলা সংঘাতের সময় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কাছে সামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য ও ছবি পাঠানোর অভিযোগ ছিল।
অন্যদিকে, বিক্ষোভের সময় গ্রেফতার হওয়া আবুলফজল সেপাহি বাদজানি এবং আমিরহোসেইন সাফারি হোসেনাবাদি নামের আরও দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড ইসফাহানের একটি চত্বরে জনসমক্ষে কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA)। গত ৮ জানুয়ারি চারজন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ১২ জনের মধ্যে তারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে "আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা" এবং "পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি"র মতো অভিযোগ আনা হয়েছিল। একই মামলায় গত ১৯ জুলাই এরফান এসফান্দিয়ারি এবং গোল মোহাম্মদ মোহাম্মদি নামের অপর দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, একটি রুদ্ধদ্বার আদালতে মাত্র একটি শুনানির মাধ্যমে এবং আসামিদের ব্যক্তিগত দায় স্পষ্ট না করেই এই ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যা সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে। গত সপ্তাহে লন্ডনের পিকাডিলি সার্কাসে ইরানের এই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন আন্দোলনকারীরা।

