থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের অদূরে এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরের চালানো ভয়াবহ গুলিবর্ষণে অন্তত সাতজন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন। এই হামলায় কিশোরটি প্রথমে নিজের বাড়িতে ও পরে তার স্কুলে গিয়ে তাণ্ডব চালায়।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, হামলাকারী কিশোরটি নন্থাবুরির বিখ্যাত দেবসিরিন স্কুলের ছাত্র ছিল। সে প্রথমে তার নিজের দাদা-দাদিকে এবং পরবর্তীতে স্কুলের পাঁচজন শিক্ষককে গুলি করে হত্যা করে। এরপর সে নিজের বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যা করে। প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, আত্মঘাতী হওয়ার সময়ও হামলাকারীর কাছে ৩০টির বেশি তাজা বুলেট অবশিষ্ট ছিল।
এই হামলায় আহতদের মধ্যে অন্তত নয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দেশের জাতীয় পুলিশ প্রধান জেনারেল কিত্তিরত ফানপেত সাংবাদিকদের জানান, ফরেনসিক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী হামলাকারীর নিশানা অত্যন্ত নিখুঁত ছিল এবং বেশ কয়েকটি গুলি শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে লেগেছিল। প্রধানমন্ত্রী এই হামলাটিকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক বলে অভিহিত করেছেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রী জানায়, সে যখন তার শিক্ষিকার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, ঠিক তখনই হামলাকারী সেখানে এসে গুলি চালায়। সে বলে, ‘তিনি আমার সাথে কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই সে এসে তাকে গুলি করে। আমি ধুলোর মেঘ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনি।’ স্কুল ইউনিফর্ম পরা মেয়েটি তার মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে জানায়, হামলাকারী কীভাবে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গিয়ে গুলি চালাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বন্ধুদের সাথে স্কুলের দেয়াল টপকে পালিয়ে সে নিজের প্রাণ বাঁচায়। তার মা জানান, মেয়েটি এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে সে ভেবেছিল আর কখনো তার মায়ের সাথে দেখা হবে না।
আরেক শিক্ষার্থী জানায়, সে প্রথমে গুলির শব্দকে বাজি ফোটানোর শব্দ মনে করেছিল। সে বলে, ‘প্রথমে অনেকগুলো গুলির শব্দ শোনা যায়—বাং বাং বাং। তারপর সব শান্ত হয়ে যায়। এরপর আবার শব্দ শুরু হয়।’ ঘটনার সময় দেবসিরিন স্কুলের শিক্ষার্থী ও কর্মীদের আতঙ্কিত হয়ে পালাতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে (গ্রিনিচ মান সময় ০৩:০০) এই হামলার ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পরপরই পুলিশ পুরো স্কুল এলাকা ঘিরে ফেলে এবং প্রমাণের খোঁজে তল্লাশি চালায়। স্কুলের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জরুরি রক্তদানের আহ্বান জানানো হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে আশেপাশের অন্যান্য স্কুলের ক্লাস সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয় যাতে শিক্ষার্থীরা দ্রুত বাড়ি ফিরে যেতে পারে।
পুলিশ এখনো হামলাকারী কিশোরের নাম প্রকাশ করেনি এবং তার এই হামলার উদ্দেশ্যও জানা যায়নি। তবে তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ তার বাড়ি থেকে কম্পিউটার ও বেশ কিছু বক্স উদ্ধার করেছে। বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর ওই কিশোর তার দাদা-দাদির সাথেই থাকত, যাদের সে স্কুলে যাওয়ার আগে হত্যা করে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার বাবা ও মা উভয়কেই স্থানীয় থানায় তলব করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৮৮৫ সালে ব্যাংককে প্রতিষ্ঠিত দেবসিরিন স্কুলটি থাইল্যান্ডের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, যার শাখা রয়েছে দেশজুড়ে। এই স্বনামধন্য স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বহু বিশিষ্ট কূটনীতিক, ক্রীড়াবিদ এবং বেশ কয়েকজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন। চলতি বছরে থাইল্যান্ডের কোনো স্কুলে এটি দ্বিতীয় গুলিবর্ষণের ঘটনা, যা দেশটিতে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন আরও কঠোর করার জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।

