গত মাসে তুরস্ক সফরের সময় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গোপনে বিমান পরিবর্তনের ঘটনার সময় তাঁর মন্ত্রিসভার দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ডিকয় (প্রতারণামূলক) বিমানেই রয়ে গিয়েছিলেন। সিবিএস নিউজের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সেই বিমানেই অবস্থান করছিলেন যা সবাই ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বলে ধরে নিয়েছিল। ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির কারণে ট্রাম্পকে অন্য একটি ফ্লাইটে সরিয়ে নেওয়া হলেও এই দুই মন্ত্রী সেখানে যোগ দেননি।
গত ৮ জুলাই ট্রাম্প যখন ওই দুই কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে নিয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানে চড়েন, তখন তাকে গোপনে একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে একটি সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির বহনকারী যেকোনো বিমানকেই ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বলা হলেও, এক্ষেত্রে মূল বিমানটি তার পূর্বের কল সাইন বা সংকেত বজায় রেখে ডিকয় বা প্রতারণামূলক বিমান হিসেবে কাজ করে। সিবিএস নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের কোনো ক্ষতি হলে বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা (লাইন অব সাকসেশন) বজায় রাখার স্বার্থেই রুবিও এবং বেসেন্ট প্রথম বিমানে রয়ে যান।
মার্কিন নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট মারা গেলে বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে প্রথমে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ক্ষমতা গ্রহণ করবেন। এরপর যথাক্রমে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার, সিনেটের প্রেসিডেন্ট প্রো টেম্পোর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী এই লাইনে রয়েছেন।
এয়ার ফোর্স ওয়ান হিসেবে চিহ্নিত প্রথম বিমানে আরও ছিলেন হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার এবং হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেং। অন্যদিকে, আঙ্কারা থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বহনকারী দ্বিতীয় বিমানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও ছিলেন বলে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বিবিসি হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করেছে।
গত সোমবার রাতে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, এই বিমান পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং সিক্রেট সার্ভিস নিয়েছিল। তারা চেয়েছিল ট্রাম্প যেন অন্য একটি ফ্লাইটে ভ্রমণ করেন। তবে হুমকির সুনির্দিষ্ট ধরন সম্পর্কে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু জানাননি, শুধু বলেছেন যে তিনি ‘প্রচুর হুমকি’ পেয়ে থাকেন। তিনি যোগ করেন, ‘যেকোনো প্রভাবশালী প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেই অনেক হুমকি থাকে।’
এই অভিযানের বিষয়ে বিমানের ক্রু, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা আগে থেকে কতটা জানতেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিমানে থাকা সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, তারা ডিকয় ফ্লাইটে রয়েছেন সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না।
সিক্রেট সার্ভিসের ভাষায় এ ধরণের কৌশলকে ‘শেল গেম’ বলা হয়, যা অত্যন্ত সাধারণ। উদাহরণস্বরূপ, প্রেসিডেন্টের জন্য ব্যবহৃত সাঁজোয়া লিমুজিন বা হেলিকপ্টারগুলো প্রায়ই যাতায়াতের সময় নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে বিভ্রান্তি তৈরি করে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে আরও জটিল কৌশল ব্যবহার করা হয়। সাধারণত এ ধরণের ক্ষেত্রে এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিকদের আগে থেকে ব্রিফ করা হয় এবং রিয়েল-টাইমে তা প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানো হয়।
এর আগে ২০০০ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যখন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যান, তখন তিনি একটি অচিহ্নিত বিমানে চড়েছিলেন, যা এয়ার ফোর্স ওয়ানের লোগোযুক্ত একটি ডিকয় বিমানের পর অবতরণ করে। সেই সফরের আগে হোয়াইট হাউস ইউএসএ টুডের সাংবাদিক সুসান পেজকে (যিনি তৎকালীন হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ছিলেন) এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা জানিয়েছিল। সুসান পেজ এই সপ্তাহে প্রথমবারের মতো প্রকাশ করে বলেন, ‘সেখানে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে অসাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ডিকয় বিমান ব্যবহারের বিষয়টিও ছিল, তারা আমাকে তা জানিয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই এই বিপদ যেমন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের জন্য ছিল, তেমনি সফর কাভার করা সাংবাদিকদের জন্যও ছিল।’
আঙ্কারা সফরের সময় রুবিও, বেসেন্ট, অন্যান্য স্টাফ এবং হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল বহনকারী বিমানটি কোনো বিপদের মুখে পড়েছিল কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনও এই ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।

