মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ডক্সবারিতে ২০২৩ সালে নিজের তিন সন্তানকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত লিন্ডসে ক্ল্যান্সির চলমান বিচারপ্রক্রিয়া এখন আদালতের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গত ২০ জুলাই এই মামলার বিচার শুরু হওয়ার পর থেকেই টিকটক ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ নিজেদের মতো করে রায় ঘোষণা করে চলেছে।
প্রসিকিউটরদের দাবি, লিন্ডসে পরিকল্পিতভাবে তার স্বামীকে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী কেভিন রেডিংটন যুক্তি দিচ্ছেন যে, লিন্ডসে প্রসবোত্তর সাইকোসিস (postpartum psychosis) বা তীব্র মানসিক জটিলতায় ভুগছিলেন এবং নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এই কাজ করেছেন, যার জন্য তিনি আইনত দায়ী নন।
তবে টিকটকের দর্শকরা আদালতের লাইভস্ট্রিম দেখে ভিন্ন এক তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে উঠছেন। তাদের অনেকের ধারণা, লিন্ডসেকে আসলে তার তৎকালীন স্বামী প্যাট্রিক ক্ল্যান্সি ফাঁসিয়েছেন। প্যাট্রিক আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে ঘটনার সময় তিনি ওষুধের দোকান সিভিএস (CVS)-এ ছিলেন। কিন্তু অনলাইন ‘গোয়েন্দারা’ এই অজুহাতকে ‘অতিরিক্ত নিখুঁত’ বলে সন্দেহ করছেন। এমনকি ঘটনার রাতে ওষুধের দোকানে প্যাট্রিকের পরিবর্তে তার কোনো ‘বডি ডাবল’ বা সদৃশ ব্যক্তি গিয়েছিল বলেও দাবি করছেন কেউ কেউ। প্যাট্রিকের পরবর্তী সময়ে পুনরায় বিয়ে করা এবং নিউ ইয়র্ক সিটিতে চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ভিত্তিহীন সব উদ্দেশ্য খোঁজার চেষ্টা চলছে অনলাইনে। যদিও পুলিশ প্যাট্রিককে আগেই সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে এবং তিনি এই মামলায় অভিযুক্ত নন। ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে প্যাট্রিক নিজেই বলেছিলেন, লিন্ডসে কোনো দানব নন, তিনি কেবল অসুস্থ ছিলেন।
এই মামলার উন্মাদনা এতটাই ছড়িয়েছে যে, গত ১১ আগস্ট আইনজীবী রেডিংটন আদালতে এমিলি থর্নডাইক নামের এক টিকটকারকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করার আবেদন জানান। এমিলি ম্যাকলিন হাসপাতাল নামের একটি মানসিক নিরাময় কেন্দ্রের সমালোচনা করে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন, যেখানে লিন্ডসে ২০২৩ সালের নতুন বছরের আগের দিন (New Year's Eve) ভর্তি হয়েছিলেন। রেডিংটন দাবি করেন, প্রসিকিউশন এই হাসপাতালকে অত্যন্ত উন্নত মানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানোর যে চেষ্টা করছে, এমিলির সাক্ষ্য তার বিরোধিতা করবে। এ সময় রেডিংটন আদালতে রসিকতা করে বলেন, "আমি টিকটক কী তা ভালো করে জানিই না।" তবে প্রসিকিউটর জেনিফার স্প্রেগের আপত্তির মুখে বিচারক উইলিয়াম সুলিভান এমিলিকে সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমতি দেননি। প্রসিকিউটর যুক্তি দেন যে এমিলি কোনো বিশেষজ্ঞ নন, তিনি কেবল মামলার খোঁজখবর রাখছিলেন।
বোস্টন ইউনিভার্সিটির মিডিয়া সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক কেটি কোডুতো এই পরিস্থিতিকে ‘ফরেনসিক ফ্যানডম’ (forensic fandom) হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর অর্থ হলো, মানুষ কেবল কোনো ঘটনায় আগ্রহীই থাকে না, বরং তারা মনে করে যে তারা নিজেরাই এর সমাধান করতে পারবে। কোডুতোর ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি অপরাধমূলক কাহিনীর (true crime) দর্শকরা অনেক সময় একপ্রকার বাধ্যবাধকতা থেকে অনলাইনে পোস্ট করেন এবং ঘটনার সাথে কাল্পনিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ২০২১ সালে গ্যাবি পেটিটো নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাতেও ইন্টারনেটে এমন ব্যাপক অপেশাদার তদন্তের ঢল নেমেছিল।
এই মামলাটি প্রসবোত্তর সাইকোসিস সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বাড়িয়েছে, যা প্রতি ১,০০০ জন প্রসূতির মধ্যে ১ থেকে ২ জনের ক্ষেত্রে দেখা যায়। লিন্ডসের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা আদালতে জানিয়েছেন যে, তৃতীয় সন্তানের জন্মের পর থেকেই লিন্ডসে আত্মহত্যার চিন্তা এবং বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। লিন্ডসের সাবেক ন্যানিও (গৃহকর্মী) সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন যে অসুস্থ হওয়ার আগে লিন্ডসে অত্যন্ত ভালোবাসাময় একজন মা ছিলেন। কিন্তু টিকটকের অবাস্তব তত্ত্বগুলোর কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাবিষয়ক আলোচনা অনেক সময় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
