শ্রীলঙ্কা সফরের টেস্ট ম্যাচ শুরুর আগে বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছেন দেবদত্ত পাডিক্কাল। সাই সুদর্শন সময়মতো ফিট হতে না পারায় ভারতীয় দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিন নম্বর পজিশনটি পাডিক্কালের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। ম্যাচের দুই দিন আগে নেটে অধিনায়ক শুভমন গিলের সাথে দীর্ঘক্ষণ ব্যাটিং অনুশীলন করেছেন তিনি। উপমহাদেশে নিজের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলার প্রস্তুতি হিসেবে কোনো খামতি রাখছেন না এই বাঁহাতি ব্যাটার। তিন ঘণ্টার নেট সেশন শেষে পাডিক্কালকে মূল মাঠে গিয়ে ক্লোজ ক্যাচিংয়ের অনুশীলন করতেও দেখা গেছে, যা ইঙ্গিত করে যে ম্যাচে তাকে হয়তো শর্ট লেগ পজিশনে ফিল্ডিং করতে দেখা যেতে পারে।
সাই সুদর্শনের ইনজুরি নিয়ে ম্যাচের আগের দিন অধিনায়ক শুভমন গিল বলেন, সাইয়ের ছিটকে যাওয়াটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। মনে হচ্ছিল ও এই সিরিজের অংশ হতে পারবে। কিন্তু আমরা ক্রমাগত ওর স্ক্যান করিয়েছি এবং ওর ইনজুরির আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছিল না। তাই অনেক সময় খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে আমরা সেই ঝুঁকি নেব কি না।
২০২৩ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (ডব্লিউটিসি) ফাইনালের পর থেকেই ভারতের তিন নম্বর পজিশনটি নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। নির্বাচকরা চেতেশ্বর পূজারাকে দল থেকে বাদ দেওয়ার পর এবং রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলির ইনজুরি ও অবসরের পর এই পজিশনটি নিয়ে এক প্রকার মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা শুরু হয়েছে। তবে গিলের নেতৃত্বে এবং গৌতম গম্ভীরের কোচিংয়ে এই পজিশনটি যেভাবে সামলানো হচ্ছে, তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।
ইংল্যান্ড সফরে সাই সুদর্শন প্রথম ম্যাচে খেলার সুযোগ পেলেও পরের ম্যাচেই কৌশলগত কারণে তাকে বাদ দেওয়া হয়। মাঝে করুণ নায়ারকে দুটি টেস্টে সুযোগ দেওয়া হলেও এরপর আবার সুদর্শনকে ফিরিয়ে আনা হয়। ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে হয়তো এমন সিদ্ধান্ত যৌক্তিক ছিল, কিন্তু এর ফলে সুদর্শন বা নায়ার কেউই নিজেদের এই পজিশনে থিতু করতে পারেননি। এমনকি ঘরের মাঠেও কাউকে দীর্ঘ সুযোগ দেওয়ার নজির দেখা যায়নি। অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সুদর্শন খেললেও এক মাস পর কলকাতায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অতিরিক্ত অলরাউন্ডার হিসেবে ওয়াশিংটন সুন্দরকে খেলানো হয়। পরে গিলের ইনজুরির কারণে সেই পরিকল্পনাও এক ম্যাচ পরেই বাতিল করতে হয়।
আধুনিক ক্রিকেটের ধারা অনুযায়ী হয়তো ভারত এই পজিশনে নমনীয় হওয়ার অজুহাত দেখাতে পারে। অথচ টেস্ট ইতিহাসের শীর্ষ ১০ রান সংগ্রাহকের মধ্যে ৩ জনই ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় খেলেছেন ৩ নম্বরে, আর শীর্ষ ২০ জনের তালিকা হিসাব করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ জনে। ভারত নিজেও রাহুল দ্রাবিড়ের মতো একজন দীর্ঘমেয়াদী তিন নম্বর ব্যাটারের সুবিধা পেয়েছে, যিনি এই পজিশনে খেলে ১০ হাজারের বেশি রান করেছেন। এরপর চেতেশ্বর পূজারা ১৩ বছর ধরে ১৫৫টি ইনিংসে খেলে ৬,৫২৯ রান করে দ্রাবিড়ের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পজিশনে কে স্থায়ী হবেন, তা অনিশ্চিত।
দ্রাবিড় বা পূজারার মতো খেলোয়াড় হুট করে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই পজিশনের জন্য একজন খেলোয়াড়কে তৈরি করতে হলে তার ফর্মের উত্থান-পতনের সময়েও তাকে পর্যাপ্ত সমর্থন দিয়ে যেতে হয়। তবে ভারত বর্তমানে সেই পথে হাঁটছে না বলেই মনে হচ্ছে। টপ অর্ডারে কেএল রাহুল, যশস্বী জয়সওয়াল এবং শুভমন গিলের জায়গা নিশ্চিত থাকায় হয়তো ভারত তিন নম্বর পজিশন নিয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সাহস পাচ্ছে। কিন্তু এই 'পারফর্ম করো নয়তো বাদ পড়ো' নীতি চলতে থাকলে ব্যাটাররা কখনোই নিজেদের মেলে ধরতে পারবেন না এবং শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেটই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আগামী দুই সপ্তাহ শ্রীলঙ্কায় পাডিক্কাল এই পজিশনে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু এরপর কী হবে তা এখনো রহস্যে ঘেরা। নভেম্বরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজে সাই সুদর্শন ফিট হলে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে? কিংবা আগামী বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে কে খেলবেন এই পজিশনে? ভারতের বর্তমান পরিকল্পনা থেকে এর কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। গিল আপাতত এই সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখলেও, শেষ পর্যন্ত ভারতকে একটি স্থায়ী সিদ্ধান্তে আসতেই হবে, যা নির্ধারণ করবে এই পজিশনে ভারতের ভবিষ্যৎ কেমন হবে।

