তালিবান শাসনের ৫ বছর: আফগান নারীদের বদলে যাওয়া জীবনের গল্প

আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের পতনের পর ২০২১ সালে পুনরায় ক্ষমতা দখল করে কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠী তালিবান। এর পর থেকে গত পাঁচ বছরে দেশটির প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ (২২ মিলিয়ন) নারী ও মেয়ের অধিকার ক্রমাগত খর্ব করা হয়েছে। বর্তমানে আফগান নারীদের জীবন এক অচেনা বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বলে বিবিসির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ক্ষমতা দখলের পর থেকে তালিবান শাসকেরা ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছে। একই সাথে পুরুষ অভিভাবক বা এসকর্ট ছাড়া নারীদের একা চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং বাল্যবিয়েকে আইনি অনুমোদন দেওয়ার মতো বিতর্কিত আইনও আনা হয়েছে। বর্তমানে আফগানিস্তানই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিজেদের অধিকার হারানোর এই করুণ চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে অনেক নারীই তালিবানের প্রতিশোধের ভয়ে নিজেদের আসল নাম প্রকাশ করতে চাননি। কাবুলের বাসিন্দা এলা বলেন, মানুষ এখন দারিদ্র্য ও দৈনন্দিন কষ্টের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের শিক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের আশা বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে। এখন কেবল বেঁচে থাকাই তাদের একমাত্র অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শাকিবা নামের এক তরুণী জানান, ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট যখন আফগান সরকারের পতন ঘটে, সেটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিন। প্রতি বছর এই দিনটি ফিরে এলে তার মনে হয় পুরোনো ক্ষত আবার নতুন করে জেগে উঠছে। শাকিবা অনলাইনে মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করতে পারলেও পাইলট হওয়ার যে স্বপ্ন তিনি ছোটবেলা থেকে দেখতেন, তা এখন সম্পূর্ণ অসম্ভব বলে মনে করেন।

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে প্রায় ২৬ লাখ মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর পর আর স্কুলে যেতে পারছে না। এই বিষয়ে তালিবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, নারীদের জন্য সবকিছু নিষিদ্ধ করা হয়েছে—এমন তথ্য সঠিক নয়। তার দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ মেয়ে স্কুল ও মাদ্রাসায় যাচ্ছে। তবে মাদ্রাসা থেকে কীভাবে নারী চিকিৎসক তৈরি হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারীদের সব ক্ষেত্রে পুরোপুরি বাধা দেওয়া হয়নি, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কেবল একটি ছোট অংশ সীমিত রাখা হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষার সুযোগ বন্ধ হওয়ায় আফগানিস্তানে বর্তমানে মাত্র ৭ শতাংশ নারী কর্মসংস্থানে যুক্ত আছেন। জুহাল নামের একজন সাবেক নিউজ অ্যাঙ্কর জানান, তালিবানের একের পর এক নিষেধাজ্ঞার কারণে তাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, আগে যেখানে অ্যালার্মের শব্দে ঘুম থেকে উঠে টিভির ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিতাম, এখন সেখানে সকালে ঘুম থেকে উঠে জানি যে সারাদিন ঘরেই বসে থাকতে হবে।

তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুত্তাকি দাবি করেছেন, ২০২০ ও ২০২১ সালে যেখানে আফগানিস্তানে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার, তা এখন বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, নারীরা শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি ও ব্যবসায় যুক্ত আছেন এবং তাদের সব ধরনের কার্যক্রম থেকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি।

এদিকে তালিবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটিতে পুনরায় জনসমক্ষে চাবুক মারার মতো শারীরিক শাস্তি দেওয়া শুরু হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে শত শত মানুষকে চাবুক মারা হয়েছে বলে সরকারি রেকর্ডে বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। শায়মা নামের এক নারী জানান, তাকে ৫০ বার চাবুক মারা হয়েছিল, যার ফলে তার শরীরে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে এবং তার পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তাকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল যে তিনি একজন ধর্মত্যাগী এবং কাফেরদের সাথে কাজ করছেন। প্রায় ২০০ জন পুরুষের সামনে তাকে এই শাস্তি দেওয়া হয়।

মনিঝা নামের আরেক নারীকে এক পুরুষের সাথে বন্ধুত্বের অপরাধে ৩9 বার চাবুক মারা হয় এবং কারাগারে বন্দি করা হয়। তিনি জানান, কারাগারে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে যা তিনি তার নিজের মাকেও বলতে পারেননি। মুক্তির পর তিনি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন।

আফগানিস্তানে মাতৃমৃত্যুর হার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। পুরুষ চিকিৎসকের কাছে নারীদের চিকিৎসা নেওয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেক নারী ও মেয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মারজিয়া নামের এক মিডওয়াইফ জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ক্লিনিকে আসা ৪৫ বছর বয়সী এক মা তার সামনেই মারা যান। শিশুটিকে বাঁচানো গেলেও তার অন্য ছয়টি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তিত। মারিয়াম নামের এক গর্ভবতী নারী বলেন, পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে আমার অনাগত কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে? সে তো আমার মতো স্কুল শেষ করার সুযোগও পাবে না। প্রসবের সময় যদি কোনো নারী চিকিৎসকের প্রয়োজন হয়, তখন যদি কোনো নারী চিকিৎসক না থাকে, তবে তা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।

তবে এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু নারী এখনো আশার আলো দেখছেন। ২৪ বছর বয়সী নুরি আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়ছিলেন। তালিবান ক্ষমতা নেওয়ায় তিনি ডিগ্রি শেষ করতে না পারলেও একটি জ্যাম তৈরির কোম্পানিতে চাকরি নেন। এখন তিনি নিজের একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন যেখানে ১০ জন সাহসী নারী কাজ করছেন। ১৩ বছর বয়সী আসমা নামের এক কিশোরী চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সে বলে, একদিন সবকিছু বদলে যাবে, তবে আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে।

কাবুলের ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট এলা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আফগান নারীদের পক্ষে কথা বলুন, তাদের শিক্ষা ও কাজের অধিকারকে সমর্থন করুন। বিশ্ববাসীর মনোযোগ যেন এই পরিস্থিতির ওপর থাকে। আমাদের এখন সংহতি প্রয়োজন, নীরবতা নয়।

শিরোনাম :
ট্রাম্পের বিমানে ম্যাকডোনাল্ডসের আধিক্য নিয়ে মুখ খুললেন কেনেডি অনলাইন ডেটিংয়ে ‘সোয়াইপ’ ক্লান্তি: সমস্যা সমাধানে কি এআই-ই ভরসা? অলরাউন্ডারের শূন্যতা পূরণে মানব সুথারের ওপর আস্থা রাখছেন গিল তুরস্কের একে পার্টির ২৫ বছর পূর্তি: ‘আমরা কেবল শুরু করেছি’ নরসিংদীতে ছাত্রদল নেতা মাসুম হত্যায় প্রধান আসামিসহ গ্রেপ্তার ৫ মিয়ানমারে বন্যার মাঝে ইয়াঙ্গুনে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ ১৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ফুটবলে ফিরলেন চেলসির মুদ্রিক বেকার ও উইনফিল্ড-হিলের নৈপুণ্যে ফাইনালে সানরাইজার্স ৪৫ মিলিয়নের প্রস্তাব ফেরানো মার্টিনেলিকে পেতে চায় নাপোলি ও রোমা ঘরোয়া সহিংসতার অভিযোগে ৮ ম্যাচ নিষিদ্ধ এনএফএল তারকা জেমস পিয়ার্স ট্রাম্পের বিমানে ম্যাকডোনাল্ডসের আধিক্য নিয়ে মুখ খুললেন কেনেডি অনলাইন ডেটিংয়ে ‘সোয়াইপ’ ক্লান্তি: সমস্যা সমাধানে কি এআই-ই ভরসা? অলরাউন্ডারের শূন্যতা পূরণে মানব সুথারের ওপর আস্থা রাখছেন গিল তুরস্কের একে পার্টির ২৫ বছর পূর্তি: ‘আমরা কেবল শুরু করেছি’ নরসিংদীতে ছাত্রদল নেতা মাসুম হত্যায় প্রধান আসামিসহ গ্রেপ্তার ৫ মিয়ানমারে বন্যার মাঝে ইয়াঙ্গুনে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ ১৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ফুটবলে ফিরলেন চেলসির মুদ্রিক বেকার ও উইনফিল্ড-হিলের নৈপুণ্যে ফাইনালে সানরাইজার্স ৪৫ মিলিয়নের প্রস্তাব ফেরানো মার্টিনেলিকে পেতে চায় নাপোলি ও রোমা ঘরোয়া সহিংসতার অভিযোগে ৮ ম্যাচ নিষিদ্ধ এনএফএল তারকা জেমস পিয়ার্স